২০২১ সালে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল বিমানবন্দরের দৃশ্য বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। মার্কিন বাহিনীর দ্রুত প্রত্যাহারের পর হাজার হাজার মানুষ বিমানবন্দরের দিকে ছুটে আসে। কেউ বিমানের ডানায় ঝুলে পালানোর চেষ্টা করেছে, কেউ রানওয়েতে দৌড়েছে, কেউ আবার শেষ মুহূর্তে বুঝতে পেরেছে—যে শক্তির ওপর তারা নির্ভর করেছিল, সেই শক্তি নিজের স্বার্থ শেষ হলে কাউকেই আর রক্ষা করে না।
এই দৃশ্য শুধু একটি দেশের পতনের প্রতীক ছিল না; এটি ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
বিশ্ব রাজনীতিতে বড় শক্তিগুলো সাধারণত নিজেদের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। তারা বিভিন্ন দেশে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে স্থানীয় গোষ্ঠী, রাজনৈতিক শক্তি, বুদ্ধিজীবী, সামরিক অংশীদার বা সুবিধাভোগী শ্রেণিকে ব্যবহার করে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, সেই সম্পর্ক খুব কম ক্ষেত্রেই স্থায়ী হয়। স্বার্থের সমীকরণ বদলে গেলে পুরনো মিত্ররাও দ্রুত অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতা শুধু আফগানিস্তানে নয়; ইতিহাসের নানা পর্যায়ে দেখা গেছে। কখনো মধ্যপ্রাচ্যে, কখনো লাতিন আমেরিকায়, কখনো আফ্রিকায়—বহু রাজনৈতিক গোষ্ঠী বিদেশি শক্তির সহায়তায় ক্ষমতার কাছাকাছি গেলেও শেষ পর্যন্ত নিজেদের জনগণের আস্থা হারিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই প্রশ্ন নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তির কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ। কখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্, কখনো চীন, কখনো ভারত—প্রত্যেক শক্তিই নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী বাংলাদেশের ভেতরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি জনগণের চেয়ে বিদেশি সমর্থনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন রাজনীতি জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে হয়ে যায় “কার পেছনে কোন শক্তি আছে”—এই হিসাবের খেলা। এতে গণতান্ত্রিক আস্থা দুর্বল হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ হয়, এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ জন্ম নেয়।
তবে এই আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি—কাউকে “দালাল” আখ্যা দিয়ে ঘৃণা বা সহিংসতা উসকে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, বিদেশি প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, কিন্তু সেটি হতে হবে তথ্য, যুক্তি ও রাজনৈতিক সচেতনতার মাধ্যমে। কারণ উত্তেজনা বা প্রতিশোধের ভাষা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
কাবুল বিমানবন্দরের সেই দৃশ্য আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়:
যে রাজনীতি জনগণের আস্থার বদলে বিদেশি ছাতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তার ভিত্তি খুবই দুর্বল। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও তখন একে অপরের প্রতিদ্বন্দী হয়ে দাঁড়ায়। বাংলায় একটি কথা প্রচলিত আছে। “শিল পাটায় ঘসাঘসিতে মরিচের দফারফা”। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলি যখন তাদের চেয়ে তুলনামূলক দুর্বল একটি রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতায় নামে, তখন সেই রাষ্ট্রটির অবস্থা ঠিক প্রবাদের মরিচের মতো হয়।
আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো চিরস্থায়ী বন্ধু নয়; তারা চিরস্থায়ী স্বার্থের অনুসারী। দেশের জনগণই আসল শক্তির উৎস। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি আসে জনগণের আস্থা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ রাজনীতি এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও নির্ভর করবে সেই পথ কতটা শক্তভাবে ধরে রাখা যায় তার ওপর।
আরও পড়ুনঃ প্রথম বিদেশ সফর: কূটনীতির রশি টানাটানিতে তারেক রহমান







Leave a Reply