বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাধারণত প্রথম বিদেশ সফরকে শুধু সৌজন্য সফর হিসেবে দেখা হয় না; এটি হয়ে ওঠে নতুন সরকারের কূটনৈতিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর ক্ষেত্রে সেই প্রথম সফর এখন পরিণত হয়েছে এক জটিল ভূরাজনৈতিক পরীক্ষায়। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পরাশক্তির স্বার্থের টানাপোড়েনে পড়ে তাঁর সরকারের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের সঙ্গে আস্থার সংকট
ক্ষমতায় আসার পর শুরুতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পরিবেশ ইতিবাচকই ছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্রুত অভিনন্দন জানান এবং রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণও পাঠান।
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায় যখন সংসদে আইন পাস করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ পাকাপাকি করা হয়।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত বিএনপি সরকারের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু ভারতের দৃষ্টিতে বিষয়টি ভিন্ন। দীর্ঘদিন ধরে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। ফলে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ভারত এখন দ্বিধায় আছে—একদিকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে, অন্যদিকে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে “একপক্ষীয় অবস্থান” নেওয়ার অভিযোগেও পড়তে চায় না। এই কারণেই দিল্লির পক্ষ থেকে এখন দৃশ্যমান নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
চীনের সুযোগ ও তিস্তা প্রশ্ন
ভারতের অনীহার প্রেক্ষাপটে সরকার স্বাভাবিকভাবেই চীনের দিকে ঝুঁকছে।
দীর্ঘদিন ধরেই চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো ও কৌশলগত প্রকল্পে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে চায়। বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা তাদের বহুদিনের আগ্রহের বিষয়।
তিস্তা শুধু একটি নদী উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
চীন যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়, তাহলে বাংলাদেশে তাদের প্রভাব আরও গভীর হবে। আর সেটিই ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ। কারণ সীমান্তঘেঁষা এলাকায় চীনের বড় উপস্থিতিকে দিল্লি নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখে।
এখানেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। তিনি যদি চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান, তাহলে ভারতের অস্বস্তি বাড়বে। আবার চীনকে দূরে রাখলে বড় অর্থনৈতিক সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি
এই সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রও একটি বড় ফ্যাক্টর।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ওয়াশিংটন দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে সক্রিয়। ফলে বাংলাদেশ-চীন ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্র খুব সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশেষ করে তিস্তা প্রকল্পের মতো কৌশলগত বিষয়ে চীনের অংশগ্রহণকে ওয়াশিংটন সহজভাবে নাও নিতে পারে। কারণ বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে অবকাঠামো প্রকল্পও কেবল উন্নয়ন ইস্যু নয়; এগুলো প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশকে ঘিরে তাই যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের স্বার্থ এখন অনেকটাই একে অপরের বিপরীতে অবস্থান করছে।
বিএনপি-চীন সম্পর্কের পুরোনো স্মৃতি
ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ভালো ছিল। জিয়াউর রহমান-এর সময় থেকেই দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
তবে রাজনীতিতে অতীতের সম্পর্ক সবসময় ভবিষ্যতের আস্থা নিশ্চিত করে না।
চীন খুব হিসাবি রাষ্ট্র। তারা রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ও কৌশলগত নিশ্চয়তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে বর্তমান সরকারকে পুরোপুরি বিশ্বাস করার আগে বেইজিং বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চাইবে।
বিকল্প সফর: ভুটান বা সৌদি আরব?
এই জটিলতার মধ্যেই বিকল্প গন্তব্য হিসেবে ভুটান কিংবা সৌদি আরব-এর কথা আলোচনা হচ্ছে।
ভুটান সফর তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও নিরপেক্ষ কূটনৈতিক বার্তা দিতে পারে। অন্যদিকে সৌদি আরব সফর ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্ব বহন করতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো—ভারত, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের কোনো বড় কূটনৈতিক অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয় না। ফলে বিকল্প সফর হয়তো সাময়িক সমাধান দিতে পারে, কিন্তু মূল কৌশলগত প্রশ্নগুলো থেকেই যাবে।
নতুন সমীকরণ: মার্কো রুবিওর ভারত সফর ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক চাপ
এরই মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বর্তমানে ভারত সফরে রয়েছেন এবং দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-র সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। সফরের মূল আলোচনায় রয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীনকে মোকাবিলা, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা।
এই সফরকে অনেক বিশ্লেষক শুধু ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অংশ হিসেবেই দেখছেন না; বরং দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখছেন। বিশেষ করে “কোয়াড” জোটকে ঘিরে ওয়াশিংটনের সক্রিয়তা স্পষ্টভাবে বোঝাচ্ছে যে, ভারতকে এখন যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি কৌশলগত গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। কারণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি এই মুহূর্তে চীনের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়েন, বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো স্পর্শকাতর প্রকল্প বেইজিংকে দেন, তাহলে সেটি শুধু দিল্লি নয়, ওয়াশিংটনের কাছেও একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হতে পারে।
অন্যদিকে, ভারত এখনও তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক সংকেত দেয়নি। ফলে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি এখন দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতার মাঝখানে পড়ে এক ধরনের “অপেক্ষার কূটনীতি” চালাতে বাধ্য হচ্ছে?
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর এখন আর শুধুমাত্র সৌজন্য সফরের বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: ভারসাম্য রক্ষা
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্য ছিল “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।” কিন্তু বর্তমান বিশ্বে এই ভারসাম্য রক্ষা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হয়ে গেছে।
কারণ এখন প্রতিটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত—বন্দর, নদী, অবকাঠামো কিংবা সামরিক সহযোগিতা—বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর তাই কেবল একটি সফর নয়; এটি হবে তাঁর সরকারের কূটনৈতিক দর্শনের প্রথম বড় পরীক্ষা।
তিনি কি ভারতকে আশ্বস্ত করে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন? নাকি চীনের অর্থনৈতিক প্রস্তাব গ্রহণ করে নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করবেন? আবার যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কীভাবে সামলাবেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন দিকচিহ্ন।
আরও পড়ুনঃ বঙ্গোপসাগরের দিকে বিশ্বের নজর কেন?







Leave a Reply