সূরা আত-তাওবার ৫ নম্বর আয়াতকে অনেক সময় “আয়াতুস সাইফ” (তলোয়ারের আয়াত) বলা হয়। এটি ইসলামের সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত—এবং সবচেয়ে বেশি প্রসঙ্গবিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করা—আয়াতগুলোর একটি। এই আয়াতকে আলাদা করে উদ্ধৃত করলে মনে হতে পারে যে ইসলাম সব অমুসলিমকে হত্যা করতে বলেছে। কিন্তু পুরো সূরা, নাযিলের প্রেক্ষাপট এবং আগের-পরের আয়াত পড়লে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়।
আয়াত (অর্থ)
“অতঃপর নিষিদ্ধ মাসসমূহ অতিবাহিত হলে, মুশরিকদের যেখানে পাও, হত্যা করো, তাদের বন্দী করো, অবরোধ করো এবং প্রতিটি ঘাঁটিতে তাদের জন্য ওত পেতে থাকো। তবে যদি তারা তওবা করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
— সূরা আত-তাওবা, ৯:৫
এই অনুবাদটি আক্ষরিক অর্থের কাছাকাছি। কিন্তু এর অর্থ বোঝার জন্য প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নাযিলের প্রেক্ষাপট
সূরা আত-তাওবা হিজরি ৯ সালে নাযিল হয়। এর আগে মক্কার কিছু মুশরিক গোত্র মুসলমানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিল। পরে তাদের মধ্যে কয়েকটি গোত্র সেই চুক্তি ভঙ্গ করে এবং মুসলমানদের মিত্রদের ওপর হামলা চালায়।
এই অবস্থায় সূরার শুরুতেই ঘোষণা করা হয় যে—
- যারা চুক্তি ভঙ্গ করেছে, তাদের সঙ্গে আগের চুক্তি বাতিল।
- তাদের চার মাস সময় দেওয়া হবে।
- এরপরও যদি তারা যুদ্ধ চালিয়ে যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে।
অর্থাৎ এটি একটি চলমান যুদ্ধ ও চুক্তিভঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে নাযিল হওয়া নির্দেশ।
আগের আয়াতগুলো কী বলে?
আয়াত ১–৪ পড়লে দেখা যায়:
- সব মুশরিককে নয়, শুধু চুক্তিভঙ্গকারী গোত্রকে উদ্দেশ্য করে কথা বলা হয়েছে।
- যারা চুক্তি ভঙ্গ করেনি, তাদের সঙ্গে চুক্তি পূর্ণ মেয়াদ পর্যন্ত বহাল রাখতে বলা হয়েছে (৯:৪)।
অর্থাৎ একই সূরায় বলা হয়েছে যে, যারা বিশ্বস্ত, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়।
পরের আয়াত কী বলে?
এর পরেই ৯:৬ আয়াতে বলা হয়েছে:
যদি কোনো মুশরিক তোমার কাছে আশ্রয় চায়, তবে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পারে। এরপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও।
অর্থাৎ যুদ্ধের মধ্যেও শত্রুপক্ষের কেউ আশ্রয় চাইলে তাকে নিরাপত্তা দিতে হবে এবং নিরাপদে পৌঁছে দিতে হবে।
এটি দেখায় যে ৯:৫ কোনো নির্বিচার হত্যার নির্দেশ নয়।
অধিকাংশ তাফসিরকারের ব্যাখ্যা
প্রাচীন ও আধুনিক বহু তাফসিরকার—যেমন ইবন কাসির, আত-তাবারি এবং অন্যান্য আলেম—এই আয়াতকে মূলত চুক্তিভঙ্গকারী যুদ্ধরত মুশরিকদের প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও ইসলামী ফিকহে এই আয়াতের পরিধি নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তবু এটি যে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য আছে।
তাহলে “সব অমুসলিমকে হত্যা”—এই দাবি কি সঠিক?
ঐতিহাসিক ও পাঠগত দৃষ্টিতে না।
কারণ:
- আয়াতটি একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।
- একই সূরায় বিশ্বস্ত চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিষিদ্ধ করা হয়েছে (৯:৪)।
- আশ্রয়প্রার্থী অমুসলিমকে নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে (৯:৬)।
- কুরআনের অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:
- “ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই।” (২:২৫৬)
- “যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের দেশ থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ নিষেধ করেন না।” (৬০:৮)
কেন এই আয়াত নিয়ে বিতর্ক হয়?
কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠী এবং কিছু বক্তা ৯:৫ আয়াতটি আগের ও পরের আয়াত বাদ দিয়ে উদ্ধৃত করেন। ফলে মনে হয় এটি সব অমুসলিমের বিরুদ্ধে সর্বকালের নির্দেশ। অন্যদিকে অনেক ইসলামবিদ, ইতিহাসবিদ এবং তাফসিরকার বলেন, কুরআনের এই অংশকে সম্পূর্ণ সূরার প্রেক্ষাপটে পড়তে হবে; তা না হলে অর্থ বিকৃত হতে পারে।
সুতরাং, সূরা আত-তাওবার ৫ নম্বর আয়াতের সরল অর্থ যুদ্ধের ভাষা হলেও, তার নাযিলের প্রেক্ষাপট ছিল চুক্তিভঙ্গকারী ও যুদ্ধরত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক নির্দেশ। কেবল এই একটি আয়াতকে বিচ্ছিন্নভাবে উদ্ধৃত করে “সব অমুসলিমকে হত্যা করার নির্দেশ” বলা কুরআনের পাঠ-প্রসঙ্গের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।







Leave a Reply