আমরা সবাই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করি, “আল্লাহর আইন চাই, কোরআনের শাসন চাই” শ্লোগান দিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষদের বোকা বানাই। বাস্তবে নিজেরা কোরআনের আইন যথাযথ অনুসরণ করি কিনা, ভেবে দেখি না।
মুসলমানরা যদি ইসলাম ধর্মের রীতি-নীতি অনুসরণ করে চলতো, কোরআনে বর্ণিত আল্লাহর আদেশ-নিষেধ শতভাগ পালন করতো, তাহলে কোনো মুসলিম দেশে থানা-পুলিশ কোর্ট-কাছারি কিছুই লাগতো না। সে দেশের জিডিপি যাই হোক সে দেশ হতো পৃথিবীর স্বর্গ।
একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান বলতে আমরা কি বুঝি?
আমাদের সমাজে প্রচলিত নিয়মানুসারে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান বলতে আমরা সাধারণত বুঝিঃ
- তিনি জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও নামাজ কাজা করবেন না
- যতো দীর্ঘ এবং যতো গরমের দিনই হোক রোজা ভাঙবেন না
- লাখ টাকা দিলেও শুকরের মাংস, মদ বা সুদ-ঘুস খাবেন না
- সামর্থ্য থাকলে একাধিকবার হজ করবেন, ওমরা করবেন
- রাত জেগে তসবি তাহলীল করবেন
- কোরআন তেলাওয়াত করবেন
- মসজিদের জন্য মুক্ত হস্তে দান করবেন
- দাড়ি, টুপি, পাঞ্জাবি বা হিজাব তো অবশ্যই
হ্যাঁ অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মানুষ আছেন, যারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই লোকচক্ষুর অন্তরালেই এসব করে থাকেন। কিন্তু আমাদের নামাজ-রোজায়, পোশাক, পর্দায় অন্য আরেকজন দুস্থ মানুষের উল্লেখযোগ্য কোনো উপকারে আসে না। আল্লাহরও তাতে কিছু যায় আসে না। কারন, এগুলো হচ্ছে মূলত আত্ম উন্নয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ফর্মুলা। নিজেকে পরিশুদ্ধ করার একটি উপায়।
একজন মুসলমানকে আল্লাহর সন্তূষ্টিলাভের জন্য অবশ্যই নামাজ পড়তে হবে এবং নামাজ হলো আল্লাহর কাছে দরখাস্ত পেশ করা। আপনি সারাদিনে যে সৎকর্মগুলি করেছেন বা করছেন, বিনিময়ে আল্লাহ যেন আপনার প্রার্থণা কবুল করেন এবং তার প্রিয় বান্দাদের কাতারে সামিল করেন (সুরা ফাতেহা)।
কিন্তু কোরআনের আদেশ-নিষেধ যথাযথ অনুসরণ না করে আপনার প্রার্থণা আল্লাহর কাছে কবুল হলো কিনা, পরিশেষে এর ফলাফল কি তা ভেবে দেখি না কখনও।
কিন্তু আপনার কর্মগুলি যদি আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে না করেন তাহলে কি আপনার দরখাস্ত আল্লাহর কাছে বিবেচনাযোগ্য হবে? ‘আপনি এইচএসসি না করে, এসএসসি প্রথম বিভাগে প্রথমও হন, তাহলে কি বিশ্ববিদুয়ালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য আপনার দরখাস্ত কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নেবেন?’ দরখাস্তই বাতিল বলে গণ্য হবে। ‘আপনার বিরিয়ানি যদি মুখেই দেয়া না যায় তো আপনি ‘কেকা ফেরদৌসি’ হলেও কোনো লাভ নেই‘। তেমনি আপনার কর্ম যদি আল্লাহর কাছে বিবেচ্য না হয় তাহলেও কোনো ভালো ফল আশা করা যায় না।
সুরা বাকারার ১৭৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেনঃ
“পুণ্য শুধু পূর্ব বা পশ্চিম দিকে মুখ ফেরানো নয়, বরং প্রকৃত পুণ্য তার মধ্যেই নিহিত, যে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, আসমানী কিতাব ও নবীগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সম্পদের প্রতি ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও তা আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবী ও পিতার সন্তানদের দান করে। যারা সত্যবাদী, যারা প্রার্থনা করে, যারা দাসমুক্ত করে, যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে ও যাকাত প্রদান করে, যারা অঙ্গীকার করলে তা পূর্ণ করে, এবং যারা বিপদ, সংকট ও যুদ্ধের সময়ে ধৈর্য ধারণ করে—তারাই সত্যবাদী এবং তারাই মুমিন।“ (২:১৭৭)।
এখন একটি ভিন্ন চিত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করা যাক
একজন প্রকৃত মুসলমানের কি কি সৎকর্ম আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য, যার বিনিময়ে আল্লাহ আপনার দরখাস্ত কবুল করবেনঃ
- একজন মুসলমান মাত্রই সে জীবন মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়েও মিথ্যা কথা বলবে না
- না খেয়ে মারা গেলেও চুরি বা প্রতারণা করে না
- আমানতের খেয়ানত করে না
- কোনো অবস্থাতেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না
- মানুষের অনুপস্থিতিতে তার দোষ ত্রুটি নিয়ে কথা বলে না
- কারো নামে মিথ্যাচার করে না
- কথায় আচরণে কাউকে কষ্ট দেয় না
- কারো সাথে দুর্ব্যবহার করে না
- চাকরি বা পেশায় কোনো অসৎ উপায় অবলম্বন করে না
- ব্যবসায় অনিয়ম করে না
- অহংকার, হিংসা লোভ থেকে মুক্ত
- যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট
- অসহায় বিপদগ্রস্ত কেউ মুসলমানের কাছে গেলে খালি হাতে ফেরায় না
- চরম শত্রুরও অমঙ্গল কামনা করে না
জ্বী, হ্যাঁ। এসবই ধর্মের মৌলিক শিক্ষা। এটাই একজন প্রকৃত মুসলমানে বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্য না থাকলে কেউ একজন যতোবড় মসজিদের পেশ ইমামই হোক না কেনো, সে গুলিস্তানের নকল আইফোনের মতই ফেক মুসলমান। তাকে মুসলমান মনে করেছেন তো ঠকছেন!
এবার পাঠকরাই বিবেচনা করুন, এসব যদি হয় সকল মুসলমানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা ধর্ম, তাহলে কি ইসলাম ধর্ম আপনাকে প্রচার করতে হবে? কলেমা লেখা পতাকা নিয়ে মিছিল করে মানুষের মধ্যে এসব বৈশিষ্টের প্রতিফলন ঘটানো যাবে?
না। ‘রোলস রয়েস গাড়ির বিজ্ঞাপন দিতে হয় না’, বিজ্ঞাপন দিতে হয় ‘ফেয়ার এন্ড লাভলী’র, যেটা আসলে কোনো কাজ করে না।
“মুসলমানরা যদি প্রকৃত মুসলমান হতো, তাহলে একটি মুসলিম-প্রধান দেশে কোনো থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারির প্রয়োজন পড়তো না।“
“প্রীতিও প্রেমের পূর্ণ বাধনে যবে মিলি পরস্পরে
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখনই আমাদেরই কুড়ে ঘরে”
(শেখ ফজলুল করিমের বিখ্যাত কবিতা ‘স্বর্গ ও নরক’ থেকে)
(সজল রোশনের বক্তব্য অবলম্বনে [সম্পাদিত])
আরও পড়ুনঃ পরণীন্দা মহাপাপঃ পরনিন্দাকারী নিক্ষিপ্ত হবে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে







Leave a Reply