ছোটকালে বাবার সাথে বাজারে গেলে বাবা এক দর্জির দোকানে বসিয়ে রেখে কেনাকাটা করতেন। দর্জির দোকানদার ছিলেন একজন বয়স্ক ও সাধু প্রকৃতির সৎলোক। তিনি খুব মিশুকও ছিলেন। সবাই তাকে খুব পছন্দ করতো এবং সম্মানের চোখে দেখতো।
অন্যান্য দর্জির দোকানে তেমন বসার আসন না থাকলেও তার দোকানে বেশকিছু লোকের বসার ব্যবস্থা ছিল।
তিনি হিন্দু ধর্মের ছিলেন নাকি বৌদ্ধ ধর্মের সেটা তখন জানার কৌতূহল জাগেনি বা জানার বয়স হয়নি। তবে তার দোকান ঘরের দেয়ালে ফ্রেমে লেখা অনেক শ্লোক এবং উপদেশবাণী ছিলো, যার মধ্যে বেশিরভাগই ছিলো গৌতম বুদ্ধের বাণী। সেকারণে বড় হয়ে ধারণা করতাম, তিনি হয়তোবা বৌদ্ধ ধর্মের ছিলেন, কিংবা স্বাভাবিক ধর্মানুরাগী ছিলেন, যিনি সব ধর্মের ভালো ভালো বাণী পছন্দ হলেই তা ফ্রেমবন্দী করতেন। ভালো ভালো বাণী সম্বলিত ফ্রেম টাঙিয়ে তার ঘরের দেয়াল ভর্তি করে ফেলেছিলেন।
তার ঘরের বাণীগুলোর মধ্যে ছিলো:
“অহিংসা পরম ধর্ম”
“সাধু হও, সাধু সেজো না”
“পরনিন্দা মহাপাপ”
ইত্যাদি।
আমার আজকের লেখাটি শেষোক্ত বাণীটি নিয়ে, যা আমাদের ইসলাম ধর্মের সাথে হুবহু মিল আছে।
পবিত্র কোরআনে একটি সুরা আছে, “সুরা হামজাহ”। হুমাজাহ অর্থ “পরণীন্দকারী”।
এ সূরায় মাত্র নয়টি আয়াত আছে, যার শেষ ছয় আয়াতে একদল মানুষের পাপের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন। তাতে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, “এমন লোক অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়।”
পরের আয়াতে আল্লাহ নবীজিকে প্রশ্ন আকারে বলেছেন, “হুতামা কি তা কি তুমি জানো”?
আবার আল্লাহ নিজেই জবাব দিচ্ছেন, “ওটা আল্লাহর প্রজ্বলিত হুতাশন, যা হৃদয়কে গ্রাস করবে।”
তাফসিরকারকগণ বর্ণনা করেছেন, হুতামা এমন একটি প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ড যা তুষের অনলের মতো ধীরে ধীরে অপরাধীর, অর্থাৎ গোনাহগারের হৃদয়কে গ্রাস করবে, যে আগুন কোনোদিন নিভবে না। তাদের শাস্তির আরো আরো ভয়াবহ বর্ণনা আছে সূরায়।
বর্ণিত আয়াতগুলি থেকে এটা পরিষ্কার যে, এক শ্রেণীর লোককে তাদের অপরাধের জন্য জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হবে।
জ্বীনাহ ব্যভিচারের জন্য তওবা আছে, এক ওয়াক্ত নামাজ কাযা করলে তার তওবা আছে – কিন্তু এই তওবার অযোগ্য, ক্ষমার অযোগ্য পাপের ভয়াবহ পাপী কারা?
এ পাপিষ্ঠদের বর্ণনা সূরার শুরুর আয়াতে দেয়া আছে। এমনকি সূরার নামও তাদের নামে করা হয়েছে। সূরা হুমাজা। এই হুমাজা মানে হচ্ছে পরচর্চাকারী, পরণীন্দাকারী।
পরচর্চাকারী, পরণীন্দাকারী ওই সকল ব্যক্তি যারা সামনে বা অগোচরে মানুষের নিন্দা করে, কুৎসা রটায় বা মানুষকে বিদ্রুপ করে, মানুষের সম্মানহানি করে।
এ সূরার যে কোনো বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদ সাধারণ লেখাপড়া জানা কোনো অমুসলিমকে দিলেও তিনি মানুষের নিন্দা করা, কুৎসা রটানো বা মানুষকে বিদ্রুপ করার পরিণতি সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কি তার পরিষ্কার ধারণা দিতে পারবেন। এটা বোঝার জন্য কোনো মুহাদ্দিস বা মুফাসসিরের প্রয়োজন পড়বে না।
“দুর্ভোগ প্রত্যেকের যে সামনে বা পিছনে লোকের নিন্দা করে।” এ সূরায় নিন্দা বা সম্মানহানির কথা বলা হয়েছে কাদের? “লোকেদের”।
হিন্দু-মুসলিম, আস্তিক-নাস্তিক, আওয়ামীলীগ-বিএনপি-জামাত, কিংবা জেনারেল-সিপাহী, আইজিপি-কনস্টেবল আলাদা করে বলা হয়নি। বলা হয়েছে লোকের কথা।
যারা মানুষকে বিদ্রুপ করে, মানুষকে নিয়ে উপহাস করে বা মানুষের নিন্দা করে, কুৎসা রটায়, সম্মানহানি করে – তাদের নিশ্চিতভাবে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।
অথচ এ কাজগুলো আমরা নিঃশ্বাস নেয়ার মতো এতো স্বাভাবিকভাবে করি যে, এগুলো আমাদের কাছে ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু মনে হয় না।
ফেসবুক, ইউটিউব-এ যে সমস্ত লোকেরা কুৎসিত ভাষায় গলিগালাজ করেন তাদের বেশিরভাগই আপাতদৃষ্টিতে ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং মাদ্রাসা পড়ুয়া মাওলানা বলেই মনে হয়। তাছাড়া ওয়াজিরা তো অবলীলায় এক মওলানা আরেক মওলানার নামে খোলামেলা গীবত করেন। মতপার্থক্যের কারণে কাউকে ইহুদির দালাল, খ্রিস্টান মিশনারির গুপ্ত এজেন্ট, এমনকি কাফের, নাস্তিক বলেও ফতোয়া দিয়ে থাকেন। এদের মধ্যে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, আল-আজহারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শায়খরাও আছেন।
দেখা গেছে, বেশিরভাগ শায়খ কোরআনের কথা বললে – “নেক সুরতের ধোকাবাজ”, “আহলে কোরআন” “ফেতনাবাজ” এমন সব তকমা দিয়ে থাকেন। মাদ্রাসার উচ্চ শিক্ষিত যার সাথেই কথা হয়, কোরআনের রেফারেন্স দিয়ে কিছু বলা হলে, তিনি মানুষ রচিত হাদীস দিয়ে সেটার উত্তর দিয়ে আল্লাহর বাণী ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন। এক সময় মূল আলোচ্য বিষয় থেকে দূরে সরে যান।
পরচর্চা, পরনিন্দা, মিথ্যাচার, কারো সম্মানহানি করতে দেখলে আমরা পাশ থেকে আরও বাহবা দেই। ওয়াজে একশ্রেণির লোক হুজুর যা বলে তাতেই “ঠিক ঠিক” বলে স্বীকৃতি দেন – যেন হুজুর অনেক পুণ্যের কথা বলেছেন। বাহবা দিলে আমাদেরও পুণ্য হবে। আর যদি গোনাহ হয়, সেটা হুজুরের হবে, আমাদের কি! না রে ভাই, হাশরের মাঠে এসব হুজুরদের লণ্ঠন জ্বালিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ধর্মের নামে পুণ্যের আশায় আমরা বিভিন্ন নায়ক-নায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদদের বেজ্জতি করছি। ফেসবুকে যেসব অশ্লীল অশ্রাব্য কমেন্ট দেখি, তার জন্য কোরআন অনুযায়ী আমরা নিশ্চিতভাবে হুতামায় নিক্ষীপ্ত হবো।
পক্ষান্তরে নাচ-গান বা নাটক-সিনেমায় অভিনয় করার জন্য, হিজাব-নেকাব না পড়ার জন্য কাউকে দোযখে যেতে হবে – এটা প্রমাণ করতে মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ভাষাবিদদের সমন্বয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্ক ফোর্স গঠন করতে হবে।
আরও পড়ুনঃ ধর্মচিন্তা । কোরআন বলছে ইহুদি, খ্রিষ্টান, সাবেইনরাও বেহেশতে যাবে







Leave a Reply