বাংলার এক সময়ের রাজকীয় বাহন ‘পালকি’ এখন বিস্মৃতির অতলে

আভিজাত্যের বাহন পালকির অজানা ইতিহাস: বেহারা, বিহারী ও হারিয়ে যাওয়া এক পেশার গল্প

এক সময় বাংলার গ্রাম-গঞ্জে কিংবা শহরের জমিদারবাড়িতে পালকি ছিল আভিজাত্য, মর্যাদা ও ঐতিহ্যের প্রতীক। বিয়ের শোভাযাত্রা, জমিদারের সফর, সম্ভ্রান্ত নারীদের যাতায়াত কিংবা দূরপাল্লার ভ্রমণ—সব ক্ষেত্রেই পালকির ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। আজ সেই পালকি আর নেই। জাদুঘর, লোকসংস্কৃতির প্রদর্শনী কিংবা লোককথার পাতায় তার অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ। কিন্তু কয়েকশ বছরের ইতিহাসে পালকি কেবল একটি বাহন ছিল না; এটি ছিল বাংলার সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি, পেশাজীবী সমাজ এবং সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পালকি কী?

পালকি হলো মানুষের কাঁধে বহনযোগ্য একটি যাত্রীবাহী যান। সাধারণত কাঠ দিয়ে তৈরি একটি ছোট কক্ষ বা কেবিনের দুই প্রান্তে লম্বা বাঁশ বা কাঠের দণ্ড লাগানো থাকত। চার, ছয় কিংবা আটজন বাহক পালাক্রমে কাঁধে তুলে এটি বহন করতেন।

ভেতরে বসার জন্য গদি, বালিশ, কখনও মশারি, আবার কখনও রেশমি পর্দা থাকত। সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীরা যাতে পর্দা রক্ষা করে চলাফেরা করতে পারেন, সে বিষয়েও বিশেষ ব্যবস্থা থাকত।

‘পালকি’ শব্দের উৎপত্তি

“পালকি” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “পালঙ্ক” শব্দ থেকে বলে অধিকাংশ ভাষাবিদ মনে করেন। পালঙ্ক অর্থ শয্যা বা খাট। সেই থেকেই “পালঙ্কিকা”, “পালঙ্কী” এবং পরবর্তীকালে “পালকি” শব্দের প্রচলন ঘটে।

ইংরেজরা একে Palanquin নামে অভিহিত করতো। ইউরোপীয় ভাষায় এই শব্দটি পর্তুগিজ Palanquim থেকে এসেছে, যার মূল উৎস ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষা। সেখান থেকেও এ নামের উৎপত্তি হতে পারে।

পালকির ইতিহাস

মানুষের কাঁধে বহনযোগ্য বাহনের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। ভারতীয় উপমহাদেশে অন্তত দুই হাজার বছরেরও আগে এর ব্যবহার ছিল বলে ধারণা করা হয়।

প্রাচীন ভারতীয় ভাস্কর্য, গুপ্ত যুগের শিল্পকর্ম এবং মধ্যযুগীয় সাহিত্যে পালকির উল্লেখ পাওয়া যায়। মুঘল আমলে এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। সম্রাট, নবাব, জমিদার, ধনী ব্যবসায়ী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা পালকি ব্যবহার করতেন।

বাংলায় বিশেষ করে ১৭শ থেকে ১৯শ শতাব্দী পর্যন্ত পালকির সর্বাধিক ব্যবহার দেখা যায়। তখন রাস্তা ছিল কাঁচা, বর্ষায় কর্দমাক্ত এবং নদী-খালবহুল অঞ্চলে চলাচল ছিল কষ্টসাধ্য। এমন পরিবেশে পালকি ছিল সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক বাহন।

কারা পালকি ব্যবহার করতেন?

পালকি সাধারণ মানুষের বাহন ছিল না। এটি মূলত ব্যবহার করতেন—

  • রাজা, নবাব ও জমিদার
  • উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা
  • ধনী ব্যবসায়ী
  • সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারী
  • বর ও কনে
  • চিকিৎসক বা গুরুত্বপূর্ণ অতিথি
  • ব্রিটিশ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা

গ্রামের সাধারণ মানুষ সাধারণত হেঁটে, গরুর গাড়িতে কিংবা নৌকায় চলাচল করতেন।

বাংলার বিয়েতে পালকির গুরুত্ব

বাংলায় বিয়ের সঙ্গে পালকির সম্পর্ক বিশেষভাবে আবেগময়। বিয়ের সময় নববধূর বিদায়,

জমিদারবাড়ির আনাগোনা, দূরযাত্রা – সব ক্ষেত্রেই পালকি ছিল পরিচিত দৃশ্য। এছাড়ায়ও অনেক

কুলিন পরিবারের নারীদের শ্বশুরালয় থেকে পিত্রালয়ে কিংবা কোনো নিকয়াত্মীয় বাড়িতে

গমণাগমনেও পালকি ব্যবহারের প্রচলন ছিলো।

অধিকাংশ সক্ষম পরিবারের বিয়েতে বরযাত্রায় বর যেতেন পালকিতে। ফিরতি পথে বর কনে এক পালকিতে, কিংবা দুটি ভিন্ন ভিন্ন পালকিতে যেতেন। ভিন্ন পালকি হলে কনের পালকিতে কনের বাড়ি থেকে সাহায্যকারী হিসেবে নিকটাত্মীয়, বিশেষ করে আপন বা মামাতো ফুপাতো বোন সম্পর্কের কেউ যেতেন।

নববধূ লাল বেনারসি পরে, মুখে ঘোমটা দিয়ে, কান্নাভেজা চোখে যখন পালকিতে উঠতেন—সে দৃশ্য বাংলা সাহিত্য, কবিতা, চলচ্চিত্র এবং লোকগানে বারবার উঠে এসেছে। এরমধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘পালকির গান’ কবিতাটি অধিক প্রচারিত ও পরিচিতঃ

“পালকি চলে! পালকি চলে!
গগন-তলে আগুন জ্বলে!
স্তব্ধ গাঁয়ে আদুল গায়ে
যাচ্ছে কারা রৌদ্রে সারা!”

দীর্ঘ পথ কাঁধে ভার বহন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। পালকি বহনকারী বেহারাগণ দূরের পথে

যাওয়ার সময় তারা যখন হাঁপিয়ে উঠতো তখন তাদের নিজস্ব এক প্রকার বোল উচ্চারণ করতো।

অনেক কবি সাহিত্যিক তাদের লেখায় সে বোলটিকে ‘হুহুমনা’ বলে উল্লেখ করেছেন। এটা ছিলো

কমন বোল। অনেক সময় পালকি সওয়ারীর ওজন বেশি হলে তারা অস্পষ্ট

উচ্চারণে অশ্লীল শব্দও উচ্চারণ করতো বলে শোনা গেছে, যা

অপ্রকাশ্যই রয়ে গেছে।

পালকির বিভিন্ন ধরন

বাংলায় বিভিন্ন ধরনের পালকি প্রচলিত ছিল।

সাধারণ পালকিঃ সাধারণ যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হতো।

রাজপালকিঃ রাজা-জমিদারদের জন্য নির্মিত হতো। এতে কারুকাজ, পিতলের অলংকরণ, হাতির দাঁতের কাজ এবং উন্নত আসন থাকত।

বেহেস্তি পালকিঃ খুবই বিলাসবহুল পালকি। রেশম, মখমল, নকশা করা কাপড় ও অলংকরণে সাজানো থাকত।

বিয়ের পালকিঃ লাল, সোনালি বা রঙিন কাপড় দিয়ে বিশেষভাবে সাজানো হতো।

পালকি বহনকারীরা কারা ছিলেন?

যারা পালকি বহন করতেন, তাঁদের বলা হতো বেহারা

সাধারণত চারজন একসঙ্গে পালকি তুলতেন। দীর্ঘ যাত্রায় অতিরিক্ত দুই বা চারজন সঙ্গে থাকতেন। কিছু দূর পরপর বাহক বদলানো হতো। তাঁদের অসাধারণ শারীরিক শক্তি, সহনশীলতা এবং তাল মিলিয়ে হাঁটার দক্ষতা থাকতে হতো। অনেকটা নেপালে পাহাড়ে ভার বহনকারি কাম গাইড ‘শেরপা’দের মতো।

‘বেহারা’ শব্দটির উৎপত্তি

“বেহারা” শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে।

একটি মত অনুযায়ী এটি ফারসি-উর্দু বাহক বা বহনকারী অর্থবোধক শব্দের প্রভাব থেকে এসেছে। আরেকটি মতে, ভারতীয় বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় ভারবাহক বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দ থেকেই “বেহারা” রূপটি জনপ্রিয় হয়।

বাংলায় পালকি বহনকারীদের পরিচিতি হিসেবে “বেহারা” শব্দটিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।

পালকি বহনকারীদের ‘বিহারী’ বলা হতো কেন?

বাংলার বহু অঞ্চলে পালকি বাহকদের কথ্য ভাষায় “বিহারী” বলা হতো। এর পেছনে কয়েকটি ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে।

প্রথমত, ব্রিটিশ আমলে বর্তমান ভারতের বিহার অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক বাংলায় আসতেন। তাঁদের একটি অংশ কুলি, ভারবাহক, গৃহপরিচারক এবং পালকি বাহক হিসেবে কাজ করতেন।

দ্বিতীয়ত, কলকাতা, ঢাকা, মুর্শিদাবাদসহ বড় শহরগুলোতে বিহার থেকে আগত শ্রমিকদের এই পেশায় দেখা যেত বেশি। ফলে ধীরে ধীরে মানুষ পেশাটিকেই “বিহারীদের কাজ” হিসেবে দেখতে শুরু করে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—সব পালকি বাহক বিহারী ছিলেন না।

বাংলার নিজস্ব বহু মুসলিম, হিন্দু এবং নিম্নআয়ের গ্রামীণ সম্প্রদায়ের মানুষও এই পেশায় যুক্ত ছিলেন। কিন্তু বিহার থেকে আগত শ্রমিকদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক এলাকায় “বেহারা” ও “বিহারী” শব্দ দুটি কথ্য ব্যবহারে একাকার হয়ে যায়। তাই “সব পালকি বাহকই বিহারী ছিলেন”—এ ধারণা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়।

পালকি বাহকদের জীবন

এই পেশা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। দিনের পর দিন কাঁধে ৮০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করে(পালকি, যাত্রী ও মালপত্র মিলিয়ে) দীর্ঘ পথ হাঁটতে হতো। গরম, বৃষ্টি কিংবা শীত—সব আবহাওয়াতেই কাজ করতে হতো। পারিশ্রমিক খুব বেশি ছিল না।

তবে অভিজ্ঞ পালকি বাহকদের সমাজে আলাদা পরিচিতি ছিল। অনেক জমিদারবাড়িতে স্থায়ী পালকি বাহক নিযুক্ত থাকতেন।

ব্রিটিশ আমলে পালকি

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ও ব্রিটিশ প্রশাসনের সদস্যরা বাংলায় এসে ব্যাপকভাবে পালকি ব্যবহার করতেন।

সাধারণের ব্যবহারের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাড়ায় পালকি পাওয়া যেতো। এলাকার বড় বড় বাজারে ‘পালকি স্ট্যান্ড’ বা আস্তানা থাকতো। সেখানে গিয়ে বুকিং দিতে হতো। অনেকটা বর্তমানের ভাড়ায় চালিত ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের মতোই।

সরকারি কর্মকর্তা, বিচারক, চিকিৎসক এবং সাহেবরা অফিসে যাতায়াতেও পালকি ব্যবহার করতেন।

পালকির বিলুপ্তি

উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।

ক্রমে তৈরি হয়—পাকা রাস্তা, ঘোড়ার গাড়ি, সাইকেল, রেলপথ, মোটরগাড়ি বাস ও ট্রাক। ফলে পালকির প্রয়োজন আস্তে আস্তে কমে যায়। বিশ শতকের মাঝামাঝি এসে বাংলাদেশে পালকি কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়।

পালকি বাহকদের বর্তমান পেশা

পালকির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পেশাটিও বিলুপ্ত হয়। বংশানুক্রমিক পালকি বাহকদের উত্তরসূরিরা বর্তমানে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত। কৃষিকাজ, দিনমজুরি, রিকশা ও ভ্যান চালানো, নির্মাণশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন শ্রমিক, ঠেলাগাড়ি চালক(বর্তমানে তাও বিলুপ্ত) ইত্যাদিতে যুক্ত হয়। এখন আর কেউ জানেই না কোনটা “বেহারা” পরিবার-এমনকি অনেক পরিবার আজ নিজেরাও জানে না যে তাদের পূর্বপুরুষরা একসময় “পালকির বেহারা” ছিলো।

লোকসংস্কৃতিতে পালকি

বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে পালকির উপস্থিতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ বহু সাহিত্যিক তাঁদের রচনায় পালকির উল্লেখ করেছেন।

লোকগান, বিয়ের গান, গ্রামীণ নাটক এবং চলচ্চিত্রেও পালকি এক আবেগময় প্রতীক।

এটি শুধু যাতায়াতের বাহন নয়; বিয়েসাদী ইত্যাদিতে সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক ঐতিহ্যেরও প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

বর্তমানে কোথায়ও কি পালকি দেখা যায়?

না। কোথাও চোখে পড়ে না। শুধু জাদুঘর, কিছু বড় জমিদারবাড়ি ও ঐতিহ্যবাহী সংগ্রহশালায় পুরোনো পালকি হয়তো আছে। তবে বর্তমান প্রজবন্মের আগ্রহ নেই তাতে। এখন গ্রামাঞ্চলের নিম্নবিত্ত্বের পরিবারও একটি ট্যাক্সি ব্যবহার করে বিয়েতে। উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে হেলিকপ্টার নিয়ে বিয়ে করতেও যাচ্ছে বর্তমানে।

উপসংহার

পালকি আজ আর আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ নয়। কিন্তু এটি বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য স্মারক। রাজকীয় শৌর্য, নববধূর বিদায়, জমিদারির আভিজাত্য, গ্রামীণ জীবন, শ্রমজীবী বেহারাদের ঘাম—সবকিছু মিলিয়ে পালকি একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করে।

আধুনিক যানবাহনের ভিড়ে পালকি হারিয়ে গেলেও, তার গল্প হারিয়ে যায়নি। বাংলার লোকস্মৃতি, সাহিত্য, সংগীত ও ইতিহাসে পালকি আজও একটি জীবন্ত প্রতীক—যা আমাদের অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এক নীরব সেতুবন্ধন।

আরও পড়ুনঃ

১। মোবাইল ফোন দিয়ে সনাক্ত করুন গোপন ক্যামেরা

২। ‘ঢাকায় ৫২ বাজার ৫৩ গলি’র ইতিহাস

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top