বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৮১ সালের ৩০ মে একটি অত্যন্ত আলোচিত ও বিতর্কিত দিন। সেদিন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার হামলায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। ঘটনার পর দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়, সামরিক বিচার এবং দ্রুত বিচারের প্রক্রিয়া। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে যতটা বিচার হয়েছে, তার চেয়েও বেশি বিতর্ক হয়েছে তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়া এবং প্রকৃত ঘটনার অনুসন্ধান নিয়ে।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর মেজর জেনারেল আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই সামরিক আদালতে বহু সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়। ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং আরও অনেককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা অতি দ্রুত কার্যকর করা হয়।
তখন সরকারি সূত্রে বলা হয়েছিল, অভিযুক্ত মেজর (বহিঃ) মোজাফফর হোসেন দেশ ছেড়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে পালিয়ে গেছেন। দীর্ঘদিন ধরে জনমনে সেই ধারণাই প্রতিষ্ঠিত ছিল যে তিনি দেশের বাইরে আত্মগোপনে রয়েছেন। এতোদিনে জীবিত আছেন না মারা গেছেন, এ নিয়েও আলোভনা ছিল।
কিন্তু প্রায় ৪৫ বছর পর হঠাৎ খবর এলো—মেজর (বহিঃ) মোজাফফর হোসেনকে ঢাকার বনানীর একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করে সামরিক হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনাই নতুন করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
যদি তিনি সত্যিই দীর্ঘদিন বাংলাদেশেই অবস্থান করে থাকেন, তাহলে এত বছর তিনি কোথায় ছিলেন? কীভাবে রাষ্ট্রের চোখ এড়িয়ে বসবাস করলেন? তাঁর পরিচয়, অবস্থান কিংবা চলাফেরা সম্পর্কে কোনো সংস্থাই কি কিছু জানত না? নাকি কেউ জানলেও কোনো কারণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
আর যদি এতদিন তাঁকে গ্রেফতার করা সম্ভব না হয়ে থাকে, তাহলে এখন হঠাৎ কী এমন পরিবর্তন ঘটল যে তাঁকে আটক করা হলো?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়।
জিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়েও শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ছিল। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সেনা কর্মকর্তা। সে সময় অনেকেই অভিযোগ করেছিলেন, তদন্ত ছিল একপেশে এবং বিচার ছিল তড়িঘড়ি সম্পন্ন। সমালোচকদের ভাষায়, এটি ছিল “ফরমায়েশি তদন্ত” ও “ফরমায়েশি বিচার”। অন্যদিকে রাষ্ট্রের অবস্থান ছিল—বিদ্রোহ ও রাষ্ট্রপতি হত্যার ঘটনায় আইন অনুযায়ী বিচার হয়েছে। এই দুই বিপরীত অবস্থানের কারণে ঘটনাটি আজও বিতর্কমুক্ত নয়।
তদন্ত কমিটির প্রধান মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান নিজেও একটি আলোচিত চরিত্র। তিনি পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবাসিত সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিদেশে নিয়োগ পান। বিদেশে কর্মরত অবস্থায় তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে সে সময় অভিযোগ করা হয়েছিল যে, এই মৃত্যুর পেছনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এই অভিযোগ কখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্তও নেই।
আরও একটি বিষয় ইতিহাসে বারবার আলোচনায় এসেছে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হলেও, একই ঘটনার ধারাবাহিকতায় নিহত মেজর জেনারেল আবুল মনজুরের হত্যার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত বা বিচার কখনো হয়নি। তিনি কীভাবে নিহত হলেন, কার নির্দেশে বা কারা তাঁকে হত্যা করল—এসব প্রশ্নেরও আজ পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
মেজর (বহিঃ) মোজাফফর হোসেনের গ্রেফতার তাই শুধু একজন পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে আটক করার ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের বহু পুরোনো, অমীমাংসিত এবং বিতর্কিত একটি অধ্যায়কে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
এখন জনগণের প্রত্যাশা—এই গ্রেফতারের মাধ্যমে শুধু দণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়াই নয়, বরং দীর্ঘদিনের অজানা প্রশ্নগুলোরও উত্তর সামনে আসুক। তিনি এত বছর কোথায় ছিলেন, কীভাবে আত্মগোপনে ছিলেন, কারা তাঁকে সহায়তা করেছে, কেন এতদিন তাঁকে ধরা যায়নি—এসব বিষয়ে রাষ্ট্র যদি স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেয়, তবে ইতিহাসের বহু অন্ধকার অধ্যায় হয়তো কিছুটা হলেও উন্মোচিত হবে।
কারণ ইতিহাস শুধু শাস্তি কার্যকর করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; ইতিহাস সত্যেরও অনুসন্ধান করে।
আরও পড়ুনঃ ইতিহাস বিকৃতি ও জাতীয় বিভাজন: বাংলাদেশের জন্য কতটা বিপজ্জনক?







Leave a Reply