সোহানা সাবা। পুরা নাম – শারমিন সোহানা সাবা। গত ০৮ জুলাই ছিলো সোহানা সাবা’র চলচ্চিত্রে পথচলার ২২ বছর পূর্তি। ২০০৪ সালের এইদিনে ‘আয়না’ ছবির শুটিং ফ্লোরে প্রথম পা রেখেছিলেন তিনি। তখনও জানতেন না, অভিনয়ের এই যাত্রা একদিন বাঙালি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল একটি অধ্যায় হয়ে উঠবে। সেই তরুণী আজ ‘সোহানা সাবা’—একটি নাম নয়, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি দায়িত্ববোধ এবং নারীশক্তির এক অক্লান্ত দৃষ্টান্ত।
চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ২২ বছর পূর্ণ হলো তার। অভিনন্দন, প্রিয় সোহানা সাবা।
কবরীর চোখে সেই ‘আয়না’
২০০৬ সালের ২৬ মে। কিংবদন্তি কবরী পরিচালিত ‘আয়না’ যখন মুক্তি পায়, তখন থেকেই বোঝা যায় নতুন এক শিল্পীর আবির্ভাব ঘটেছে। কবরী যাকে বেছে নিয়েছিলেন প্রায় ২০০ জন নায়িকা-প্রার্থীর মধ্য থেকে, তিনি যেন আগুন আর মাটির মিশেলে গড়া—কোমল আর শক্ত, সংবেদনশীল আর দুর্দমনীয়।
‘আয়না’র সেই চরিত্রটি সোহানা সাবাকে শুধু রাতারাতি আলোর মুখ দেখায়নি; বরং তাকে পথ দেখিয়েছিলো এক অনন্য ঐতিহাসিক পরম্পরার। কারণ, ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ দিয়ে কবরীর যেমন অভিষেক, তেমনি কবরী তার প্রথম পরিচালিত ছবিতে সেই সুভাষ দত্তকেই অভিনয়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন—এক যুগ থেকে আরেক যুগে শিল্পের হাতবদল। আর সেই ছবির কেন্দ্রেই ছিলেন সোহানা সাবা। যেন ইতিহাস নিজেই তাকে বেছে নিয়েছিলো উত্তরসূরি হতে।
যে শিল্পী কখনও ভিড়ে মেলাননি নিজেকে
বাংলা চলচ্চিত্রের সহজ-সরল বাণিজ্যিক ধারায় ডুব দিয়ে সফল হওয়াটা হয়তো সহজ। কিন্তু সোহানা সাবা বেছে নিয়েছিলেন আরও কঠিন পথ। তিনি গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাননি। বরং চিত্রনাট্য আর চরিত্রের গভীরতা যাচাই করে প্রতিটি কাজে নিজের আত্মাকে বিলিয়েছেন।
‘খেলাঘর’-এর নারীবাদী জিজ্ঞাসা, ‘চন্দ্রগ্রহণ’-এর মনস্তাত্ত্বিক টান, ‘প্রিয়তমেষু’-র আবেগের জটিলতা, ‘বৃহন্নলা’-র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—প্রতিটি কাজে তিনি দেখিয়েছেন, অভিনয় নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ‘বৃহন্নলা’-তে তাঁর অনবদ্য অভিনয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রশংসা কুড়িয়েছে, যা বাংলাদেশি অভিনয়শিল্পের জন্য গর্বের বিষয়।
কলকাতার ‘ষড়রিপু’, দেশের ‘অসম্ভব’—সব জায়গায় তিনি নিজেকে ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপন করেছেন। প্রতিটি চরিত্র যেন তাঁর হাত ধরে প্রাণ পেয়েছে।
কোলকাতায় আরো কিছু কাজ হয়েছে তার। হরনাথ চক্রবর্তীর পরিচালনায় “এপার ওপার” এবং অন্য আরেকটি সিনেমা, যার নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি- ছবি দুটি মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলাদেশে “মানিকে লাল কাঁকড়া” ছবিটি মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। আফজাল হোসেনের পরিচাল্নায় ছবিটি শিশু একাডেমির তত্বাবধানে নির্মিত হয়েছে।
সোহানা সাবার নিজের লেখা ও প্রযোজনায় টেলিফিল্ম “একটি ডায়েরী” ধারাবাহিকভাবে এনটিভিতে প্রচারিত হয় ২০১০ সালে।
এছাড়াও সোহানা সাবার কাহিনী ও পরিচালনায় এবং তার নিজস্ব প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে বেশ কিছু কাজ।
তার প্রথম ওটিটি’র কাজ “টুইন রিটার্ন্স (Twin Returns)” ওয়েব সিরিজ ড্রামাটি ব্যপক সফলতা পেয়েছে।
রাজবাড়ী জেলার গর্বঃ শুধু অভিনেত্রী নন, একজন সৃষ্টিশীল যোদ্ধা
অভিনয় যেন তার প্রথম পরিচয়; কিন্তু তাঁর সম্পূর্ণ অবয়ব তার চেয়ে অনেক বড়ো। তিনি একজন প্রশিক্ষিত শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী, নির্মাতা, প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার। নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘খামারবাড়ি’-র মাধ্যমে নতুন নির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
আর এই ‘খামারবাড়ি’ কিন্তু নিছক কোনো নাম নয়—এটি তাঁর পৈতৃক নিবাস, রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার এক গ্রামের নাম – যা অনেকের কাছেই অজানা। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিধৃত। তাঁর বাবা ও দুই চাচা—তিন ভাই-ই মুক্তিযোদ্ধা। চার ভাইয়ের মধ্যে বাবা ছিলেন তৃতীয়। কিন্তু দুরারোগ্য ব্যাধি তাঁকে অকালে কেড়ে নেয়।
বড় চাচা স্কুল জীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার সাথে ছাত্রদের ১১ দফার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন তিনি স্থানীয় ছাত্র রাজনীতির একজন শীর্ষস্থানীয় সংগঠক ছিলেন। বর্তমানে মার্কিন মুল্লুকে বসবাস করছেন। মেজো চাচা শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়ে চিরচেনা ক্লাসরুমের স্মৃতিতে বেঁচে আছেন। ছোট চাচা রাজবাড়ী শহরে ব্যবসার সঙ্গে।
এই পরিবার থেকেই সোহানা সাবা পেয়েছেন সাহসের জিন, প্রতিরোধের মন্ত্র আর মুক্তির চেতনা। যা তার অভিনয়েও প্রতিফলিত হয়েছে বারবার।
২২ বছরের পথচলা, অজস্র প্রাপ্তি
মাত্র প্রথম ছবিতেই মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার—এমন শুরু খুব কম মানুষের হয়। কিন্তু সোহানা সাবা এই পুরস্কারকে শুধু আত্মতৃপ্তির বস্তু বানিয়ে রাখেননি; বরং তা ছিল তার আরও কঠোর পরিশ্রমের প্রেরণা।
২২ বছরের পথচলায় তিনি দেখিয়েছেন—মেধা আর নিষ্ঠা থাকলে সময় কোনো বাধা নয়, বয়স কোনো সীমা নয়, ধরন কোনো ফাঁদ নয়। তার অভিনীত প্রতিটি ছবি যেন বাংলা চলচ্চিত্রের পাঠ্য হয়ে আছে।
শুভকামনা, অশেষ ভালোবাসা
প্রিয় সোহানা সাবার ২২তম চলচ্চিত্রবার্ষিকীতে আমরা কেবল একজন অভিনেত্রীকে নয়, এক যোদ্ধাকে, এক স্বপ্নবাজ নারীকে, শিল্পের প্রতি আপসহীন এক নিষ্ঠাবান মানুষকে অভিনন্দন জানাই।
ভালোবাসা আর বিস্ময় মিশিয়ে বলি—সোহানা সাবা’র মতো একজন শিল্পী পাওয়া বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য গর্বের, অনন্য এক আশীর্বাদ।
আশা রাখি, ‘খামারবাড়ি’র নতুন প্রজন্মের কাজগুলো ভাঙবে আরও প্রাচীর, কাটবে আরও নতুন পথ, আর বাংলার সিনেমাকে নিয়ে যাবে অজানার ঠিকানায়।
২২ বছরের পথচলা শুধু শুরু। তার হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্রের আরও অনেক বসন্ত আসুক, এই কামনা করি।
**অভিনন্দন, আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা—সবসময়।**
আরও পড়ুনঃ লাইলি খালা: মুসলিম হয়েও হিন্দু পরিবারে বেড়ে ওঠা এক সংগ্রামী ভাবশিল্পী







Leave a Reply