ছোটোবেলায় ক্যারম খেলার খুব নেশা ছিলো। প্রায় প্রতিদিন স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলের বারান্দায়, আরো পরে কারো বাড়িতে ক্যারম খেলার আড্ডা জমতো – যা স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর পরও দুইতিন মাস চালু ছিলো। গ্রামের সমবয়সী ও সহপাঠী এক বন্ধু (বর্তমানে প্রয়াত) খেলার ফাঁকে ফাঁকে একটা চটুল বাক্য প্রায়ই উচ্চারণ করতো, “ঢাকার জেলায় টাকার জোরে, মরা মানুষ খাড়া করে”। বাক্যটি আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে।
“ঢাকার জেলায় টাকার জোরে, মরা মানুষ খাড়া করে”—বাংলা ভাষার এই পুরোনো চটুল বাক্যটি নিছক হাস্যরস নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সমাজের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ক্ষমতার প্রভাব এবং মানুষের অভিজ্ঞতার এক ব্যঙ্গাত্মক প্রকাশ।
অবশ্যই কেউ টাকার জোরে মৃত মানুষকে জীবিত করতে পারে না। কথাটির উদ্দেশ্য সেটি বোঝানোও নয়। বরং এটি বোঝায়, অর্থের প্রভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যে অনেক অসম্ভব কাজও সম্ভব বলে মনে হয়। যেখানে প্রভাব, ক্ষমতা ও অর্থ একসঙ্গে কাজ করে, সেখানে নিয়মকানুন, ন্যায়-অন্যায় কিংবা সামাজিক মর্যাদার হিসাব অনেক সময় বদলে যেতে দেখা যায়।
ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। বহু শতাব্দী ধরেই বাংলার অন্যতম প্রধান নগর এই ঢাকা। এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ফলে সম্পদ ও সুযোগেরও কেন্দ্রীভবন ঘটেছে এই শহরে। এই বাস্তবতা থেকেই মানুষের মুখে মুখে নানা প্রবাদ, ছড়া ও কৌতুকপূর্ণ উক্তির জন্ম হয়েছে। “ঢাকার জেলায় টাকার জোরে, মরা মানুষ খাড়া করে” তেমনই একটি লোকপ্রচলিত ব্যঙ্গোক্তি।
আজকের সমাজেও অর্থের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ভালো চিকিৎসা, উন্নত শিক্ষা, ব্যবসার সুযোগ কিংবা প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে অর্থ বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে অর্থ দিয়ে সবকিছু কেনা যায় না। সততা, বিশ্বাস, মানবিকতা, ভালোবাসা কিংবা প্রকৃত সম্মান—এসবের মূল্য টাকায় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এই কারণেই লোকমুখে প্রচলিত এমন বাক্যগুলো আমাদের শুধু হাসায় না; ভাবতেও শেখায়। এগুলো সমাজের অসংগতি, বৈষম্য ও ক্ষমতার বাস্তবতাকে সহজ ভাষায় তুলে ধরে। অতিরঞ্জনের আড়ালে এগুলো মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন।
তাই “ঢাকার জেলায় টাকার জোরে, মরা মানুষ খাড়া করে”—বাক্যটিকে আক্ষরিক সত্য হিসেবে নয়, বরং সমাজের অর্থকেন্দ্রিক বাস্তবতার একটি রসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক রূপক হিসেবেই দেখা উচিত। লোকজ প্রবাদ ও চটুল বাক্যের শক্তি এখানেই—অল্প কথায় তারা সমাজের বড় সত্যকে ইঙ্গিত করে।
আরও পড়ুনঃ রাজবাড়ী জেলার গর্ব অভিনয় শিল্পী সোহানা সাবা: চলচ্চিত্রে ২২ বছরের পথচলা







Leave a Reply