দুই ধারায় বেড়ে ওঠা এক সংগ্রামী শিল্পী
দারিদ্র্য, সংগ্রাম আর অবহেলার বাস্তবতা ছাপিয়েও লাইলি খালার সবচেয়ে বড় পরিচয় একজন জীবন সংগ্রামে বেড়ে ওঠা এক অদম্য শিল্পী। কিন্তু তার গানের ভুবন ও ব্যক্তিজীবন জুড়ে আরেকটি অনন্য ইতিহাস আছে। জন্মসূত্রে মুসলিম হয়েও তিনি বেড়ে উঠেছেন হিন্দু পরিবারে। শুধু লালন-পালনই নয়; সেই পরিবারের সাংস্কৃতিক রীতিনীতি, উৎসব, গান ও সেবার চেতনা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। দুই ধারার সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে তার অনন্য শিল্পীসত্তা, যা আজ তার কণ্ঠে ভক্তিগীতি, আধুনিক ও লোকসংগীতে প্রস্ফুটিত।
ধর্মান্তরিত নয়, সংস্কারে গড়া পরিচয়
লাইলি খালার গল্প শুরু হয় এক অনন্য সামাজিক প্রেক্ষাপটে। উল্লেখ করার বিষয় হলো, জন্মসূত্রে মুসলমান হয়েও শৈশবে পিতা-মাতা হারিয়ে কোনো এক মানবিক টানে বেড়ে ওঠেন এক মমতাময়ী হিন্দু পরিবারে। সেখানে তিনি শুধু খাওয়া-পরা নয়; শিখেছেন, সেবা, ভক্তি ও সংগীতের এক ভিন্ন রূপ। হিন্দু পরিবারে বেড়ে উঠলেও তার ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ করা হয়নি, করা হয়নি ধর্মান্তরিত। সেই পরিবারে থেকেই তাকে বিয়ে দেয়া হয়েছে তারই পছন্দের এক মুসলিম ছেলের সাথে।
এটা অনন্য উদাহরণ যে, ভিন্নধর্মাবলম্বী পরিবারে থকো তিনি তার নিজস্ব ধর্মীয় প্রথাও তিনি আঁকড়ে ধরেছেন। হিন্দু পরিবারের স্নেহ ও মুসলমান ঐতিহ্যের মূল্যবোধ—দুই মেরু মিলিয়েই তিনি বেড়ে উঠেছেন।
উদ্বুদ্ধ হওয়ার গল্প: আমি কেন এই বিষয়টিকে বড় করে দেখছি
এই বিষয়টি উদ্বুদ্ধ করার কারণ হলো, লাইলি খালার (তিনি নিজেও এক সাক্ষাৎকারে তার নাম লাইলি খালা বলে উল্লেখ করেছেন) সফল শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে ধর্মের ভিন্নতা কোনো প্রতিবন্ধকতা হয়নি—বরং তা হয়ে উঠেছে সৃজনশীলতার উৎস। একটি রক্ষণশীল সমাজ যেখানে ধর্মীয় পরিচয় মানুষকে প্রায়ই সীমাবদ্ধ করে ফেলে, সেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন যে মানবিক সম্পর্ক, শ্রদ্ধাবোধ ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন যেকোনো শিল্পীকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তার হিন্দু পালক পরিবার হয়তো তাকে সেভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে গান শেখায়নি, কিন্তু যে অনুপ্রেরণা ও আন্তরিকতা দিয়েছে তা তাকে করেছে ‘জনতার গায়িকা’।
লাইলি খালার গানের তালিকায় যেমন রয়েছে ইসলামী ভক্তিগীতি, তেমনি রয়েছে হিন্দু ভজন ও কীর্তন। তিনি কখনো এগুলোর মধ্যে ব্যবধান রাখেননি—শুধু সুর ও আবেগ দিয়ে সাযুজ্য গড়েছেন। এই বৈচিত্র্যই তাকে সাধারণ শিল্পী থেকে তুলে এনে রেখেছে অনন্য এক অবস্থানে। লালনগীতি, ভক্তিগীতি, নজরুলসঙ্গীত সব ধরণের গানই তিনি গাইতে পারেন। তার গায়নভঙ্গিতে ফুটে ওঠে একজন ‘ভাবশিল্পী’রূপে।

তার জীবন প্রমাণ করে, ‘আমি মুসলমান, কিন্তু আমি হিন্দু ঘরে মানুষ’ বক্তব্যটি তাকে দুর্বল নয়, বরং সমৃদ্ধ করেছে। সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি দেখিয়েছেন, সত্যিকারের মানবতা ধর্মের দেয়াল জানে না।
আমাদের জন্য শিক্ষণীয়
লাইলি খালার এই বিশেষ দিকটি শুধু বিনোদন জগতের নয়, সমগ্র সমাজের জন্য এক শিক্ষা। সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বাস্তব নজির তিনি। রাজনীতি বা সাম্প্রদায়িকতা নয়, মানুষের সুর আর মানবিক বন্ধনই তাকে টিকিয়ে রেখেছে। তাই তার গল্প আমরা যখন বলি, তখন শুধু গায়িকা হিসেবে নয়—বরং ‘সে এক সেতু নির্মাতা’ হিসেবে আমাদের পথ দেখায়, যেখানে ধর্মকে অতিক্রম করেও মানুষ এক হতে পারে।
এই প্রবন্ধে আমি পুরো জোর দিয়েছি ‘মুসলিম হয়ে হিন্দু ঘরে মানুষ হওয়া’ এবং তার শিল্পসত্তায় তার প্রভাব ও সমাজের জন্য শিক্ষণীয় দিকটিতে।
আরও পড়ুনঃ ২০৯১টি হৃদস্পন্দন: পলক মুচ্ছালের অসাধারণ মানবতার গল্প







Leave a Reply