“পৃথিবীব্যাপী সুলেমান বালিয়াদের মতো মানুষরা আছেন বলেই মানবতা আজও টিকে আছে।“
পৃথিবীতে কিছু মানুষ আসেন যাঁরা প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছান। আবার কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা নিঃশব্দে অন্যের সাফল্যের পথ তৈরি করে দেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান বিচারপতি রেমন্ড জোন্ডো এবং একজন সাধারণ ভারতীয় মুদি দোকানদারের কাহিনীটি ঠিক তেমনই এক নিঃস্বার্থ মানবতা এবং কৃতজ্ঞতার অনন্য দলিল।
রেমন্ড জোন্ডো দক্ষিণ আফ্রিকার বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ আসনে আসীন হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অতীত এমন মসৃণ ছিল না। সত্তরের দশকের শেষের দিকে তরুণ রেমন্ড যখন ম্যাট্রিকুলেশন শেষ করলেন, তখন তাঁর পড়াশোনা চিরতরে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। তাঁর মা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। কিন্তু তাঁর চাকরি চলে যাওয়ায় পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। রেমন্ডের পড়ার খরচ তো দূরের কথা, দুবেলার অন্নসংস্থান করাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিলো তাদের পক্ষে।
রেমন্ড সাহায্যের আশায় অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছিলেন, কিন্তু সবাই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘পড়ালেখা ছেড়ে কোনো ছোটখাটো কাজ খুঁজে নাও’। তবে রেমন্ড হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। চরম হতাশায় ডুবতে থাকা তরুণ রেমন্ড একদিন সাহস করে গিয়ে দাঁড়ালেন তাঁদের এলাকার ইক্সোপো (Ixopo) বাজারের এক অপরিচিত ভারতীয় মুদি দোকানদারের সামনে। দোকানদারের নাম ছিল সুলেমান বালিয়া (Suleman Bhalia)।
রেমন্ডের মুখে সমস্ত দুর্দশার কথা শুনে সুলেমান বালিয়া তরুণ রেমন্ডের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি আসলেই পড়তে চাও?” রেমন্ডের ইতিবাচক উত্তর শুনে সেই সহৃদয় ব্যবসায়ী কোনো প্রমাণ বা গ্যারান্টি ছাড়াই বললেন,
“আমি তোমাকে সরাসরি নগদ টাকা দিতে পারব না। তবে তুমি তোমার মাকে বলবে, প্রতি মাসে আমার দোকান থেকে তোমাদের প্রয়োজনীয় চাল, ডালসহ যাবতীয় রসদ নিয়ে যেতে। আমি খাতায় হিসাব লিখে রাখবো। তুমি যখন পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে, তখন এই টাকা শোধ করে দিও।”
এই একটিমাত্র ভরসা বদলে দিয়েছিলো রেমন্ডের জীবন। সেই মুদি দোকান থেকে পাওয়া রসদের শক্তিতেই রেমন্ড তাঁর আইন বিষয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং নিজেকে একজন নামকরা আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীতে বিচারক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।
বহু বছর পর, রেমন্ড জোন্ডো যখন নিজের পায়ে দাঁড়ালেন, তখন তিনি তাঁর মায়ের সাথে বাকি হিসাবের খাতাটি নিয়ে সুলেমান বালিয়ার দোকানে গেলেন। রেমন্ড কৃতজ্ঞতাভরে বললেন, “আমি আপনার বদান্যতায় আপনার সমস্ত ঋণ শোধ করার যোগ্যতা অর্জন করেছি। দয়াকরে আপনার পাওনা বুঝে নিন”।
তখন সেই সাধারণ মুদি দোকানদার জগৎসেরা এক উত্তর দিয়েছিলেন। তিনি টাকা ফেরত না নিয়ে বলেছিলেনঃ
“Just do to others, what I have done to you.”
(অর্থাৎ, “আমি তোমার জন্য যা করেছি, তুমিও ভবিষ্যতে অন্য কোনো অসহায় মানুষের জন্য ঠিক তাই করো। তাহলেই আমার ঋণ শোধ হয়ে যাবে।”)
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান বিচারপতি পদের জন্য প্রকাশ্যে ইন্টারভিউ চলাকালীন বিচারপতি রেমন্ড জোন্ডো যখন তাঁর জীবনের এই গল্পটি বলছিলেন, তখন তিনি আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তাঁর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিলো। তিনি জানান, সুলেমান বালিয়ার সেই মহানুভবতা তিনি কোনোদিন ভুলবেন না এবং সারাজীবন সেই আদর্শ মেনে চলার চেষ্টা করেছেন।
রেমন্ড জোন্ডোর এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে— মানুষের পরিচয় তাঁর জাতি, ধর্ম বা বর্ণে নয়, বরং তাঁর কর্মে। একজন সাধারণ দোকানদারের উদারতা কীভাবে একটি দেশের প্রধান বিচারপতি তৈরি করতে পারে, এ ঘটনা তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ। পৃথিবীজুড়ে সুলেমান বালিয়াদের মতো মানুষরা আছেন বলেই আজো মানবতা টিকে আছে।







Leave a Reply