- লীনা পারভীন
মানুষ একা হতে চায় না, কিন্তু আজকাল একাকীত্বকে ফ্যাশন হিসেবে দেখা হচ্ছে। AI আমাদের কাজ সহজ করছে, কিন্তু অনুভূতি কেড়ে নিচ্ছে। প্রযুক্তির এই কালে, মানবিকতার পুনরাবিষ্কারই আমাদের বাঁচার পথ।
লিখেছেন লীনা পারভীন
————————
একা থাকা বা একাকীত্বকে গ্লোরিফাই করা বন্ধ করুন।
যান্ত্রিক যুগেও আমি পুরনোকে খুঁজি। এই যে চারদিকে সবাই Ai টুলস শিখার জন্য ব্যস্ত। নিজেকে সমর্পণ করে দিচ্ছে। অস্তিত্ব বিলিনেও কষ্টবোধ নেই কারও। কিন্তু মানবিক ছোঁয়াকে কি কেউ অস্বীকার করতে পারবে? জানিনা কেন এই হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, স্ল্যাক, স্ন্যাপচ্যাট বা এমন শত শত যোগাযোগ মাধ্যমের কালেও আমি হাতে লেখা চিঠিকে খুঁজতে চাই। আমি চাই কেউ আমার জন্য সময় বের করে ‘কী লিখি তোমায়’ ভাবুক। আমি চাই রুলটানা কাগজে হলেও হলুদ খামের আঠা ছিড়ে কাউকে আবিষ্কার করতে।
একবার ভাবুনতো, প্রচন্ড মনখারাপে বা একাকীত্বের কালে বা অসুস্থতায় কেউ আপনার পাশে ছায়ার মত আছে। সেদিন একটা অনুষ্ঠানে কোন এক Ai এক্সপার্ট কথা বলছিলেন। কে কীভাবে টেকনোলজির ব্যবহারকে নিশ্চিত করছে বা করলে কীভাবে করবে সে নিয়েই আলাপ হচ্ছিলো। সবাই চ্যাট জিপিটি বা Generative Ai টুলস ইউজ করে কাজের জন্য বা আইডিয়া পেতে যেখানে effectively prompts ধরিয়ে দিতে পারলেই আমাকে আর ভাবতে হবেনা। চাকরের মত আমাকে সব বানিয়ে দিবে। এমন আলোচনায় এক ভদ্রমহিলার একটা উত্তর আমাকে খুব ভাবালো। সেই ভাবনাকে টেনেই আজকে আপনাদের সাথে আলাপের সূত্রপাত।
ভদ্রমহিলা জানালেন, তিনি চ্যাটজিপিটি ইউজ করেন নিজের ভেতরের রাগকে বের করে দিতে। যখন হাজব্যান্ডের উপর রাগ হয় বা কারও উপর রাগ হয় অথচ প্রকাশ করতে পারেননা তখন তিনি চ্যাট জিপিটির সাথে ঝগড়া করেন।
কথাটা তিনি হয়তো মজার ছলেই বলেছেন বা উপস্থিত সবাই হেসেছেও কিন্তু আমার মনটা ভার হয়েছে। আমি ভাবতে শুরু করলাম। মেশিন কি তাহলে আমাদের সকল আবেগ প্রকাশের একমাত্র সমাধান হয়ে যাচ্ছে? এর মানসিক প্রভাব কী? সেদিন একটা পরিসংখ্যান পড়ছিলাম যে পৃথিবীতে ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝাইমার প্যাশেন্ট বেড়ে যাচ্ছে। এর ডাক্তারি ব্যাখ্যা আমার জানা নেই কিন্তু এর সামাজিক বা মানবিক ব্যাখ্যাটা সম্ভবত আমরা পেয়ে যাব ভদ্রমহিলার উত্তরে। ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছি। একা মানে নিরবতা। একা মানে কোলাহলহীন পরিবেশে নিজের সাথে নিজে বসবাস। অনেকেই গ্লোরিফাই করেন এই বলে যে একা থাকতেও সাহস লাগে বা একা মানেই একাকীত্ব নয়। আবার অনেকেই একা থাকার মত অসহায়ত্বকে শৈল্পিক রূপ দিতে চান।
না। একা থাকা বাধ্যতামূলক বা অবিকল্প হলে সেটা পরিণতি কিন্তু গ্লোরিফাই করাটা ভুল, অন্যায়। আপনি হয়তো ম্যানেজ করতে পারেন কিন্তু অনেকেই সেটা না পেরে নিজের মধ্যে অ্যাবনর্মালিটিকে চাষ করে। ভুল ব্যাখ্যা সামাজিকভাবে ব্যধি। একা বা একাকিত্ব একে অপরের পরিপূরক। কেউ কারও চেয়ে আলাদা নয়।
তবে হ্যাঁ। আজকাল সামাজিকতার গ্রহনযোগ্যতা নেই। মতের অমিল আমাদেরকে যোজন দূরত্বে নিয়ে যায়। বাস্তবতা। যে ভদ্রমহিলা একটা টক্সিক পরিবেশে থেকেও নিজের ভেতরের গুমোট ভাবকে শেয়ার করতে পারেনা বা প্রকাশ করতে মেশিনের কাছে যায় তিনি একা বা একাকীত্বের সাথে বাস করছেন কিন্তু উনার মত লোকের সংখ্যা কি কম? না। এমন আমরা অনেকেই আছি। একটা বাসায় বাস করেও স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যোগাযোগ হারিয়ে যাচ্ছে। একই বিছানায় শুয়েও কেউ কারও অস্তিত্বের সন্ধান পায়না।
তাহলে উপায়? আছে। কিন্তু বলছিনা। ভাবতে হবে কোন উপায় আপনার জন্য প্রযোজ্য। কপিপেস্টের কালে উপায় কপি করলে রেজাল্ট ভুল আসবে। আবার এই উপায় খুঁজতে জিপিটি’র কাছে চলে যাবেননা, প্লিজ। জিপিটি তাই বলে যা তার ডিকশনারিতে আমরা তাকে দিয়েছি। তাই নিজের ক্ষমতার উপর ভরসা করতে জানতে হবে। ব্রেইনকে অ্যাক্টিভ রাখার কৌশলও কিন্তু ভাবা। মানে অ্যানগেইজ হতে হবে। যা মন চায় করতে পারতে হবে। মগজের চাইতে বড় বা শ্রেষ্ঠ ইন্টেলিজেন্সকে আর্টিফিশিয়াল হতে দিবেননা।
ওহহ, হ্যাঁ। হাজব্যান্ডের সাথে ঝগড়া করে নিজের অশান্তি বাড়াবেননা। তারচাইতে একটা সাউথের সিনেমা দেখলে ব্রেইন হালকা হবে।
বিন্দাস বাঁচুন। ছকের বাইরে বের হন। আরোপিত কোন সমাধান নিজের উপর চাপিয়ে দিবেননা। প্রবোধ দিয়ে স্বাভাবিকতা আটকে দিয়েননা। ভেতরের আপনাকে জানেন, চিনেন এবং দুজনের যৌথ ও যৌক্তিকতা দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। নিজের মনকে প্রাধান্য দিন আর মগজ দিয়ে মনকে গাইড করতে শিখেন। মগজকে মাস্টার বানালে জিপিটির ভাত থাকবেনা।

লীনা পারভীন








Leave a Reply to Make Money At Home Cancel reply