বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। একদিকে মুঘল সম্রাট আকবর-এর নাম জড়িয়ে আছে, অন্যদিকে বাংলার প্রাচীন স্বাধীন শাসক শশাঙ্ক-এর সময়কালকে অনেকেই মূল উৎস হিসেবে মনে করেন। এই দুই ধারনার মধ্যে কোনটি বেশি গ্রহণযোগ্য—তা বুঝতে হলে আমাদের ইতিহাস, যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে।
সম্রাট আকবর বাংলা সন গণনা শুরু করেন ১৫৫ খৃষ্টাব্দে। সে বছর ছিল হিজরী ৯৬৩ সাল। তার সাথে মিল রেখে সন গণনা শুরু হয়। সেই হিসেবে ৯৬৩+৪৭০=১৪৩৩ বঙ্গাব্ এবং ১৫৫৬+৪৭০=২০২৬ খৃষ্টাব্দ। তবে হিজরী সন গণনা হয় চন্দ্রের সাথে মিল রেখে যা প্রতিবছর ১০-১১ দিন কম হয়। সেকারণে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে হিজরী ১৪৪১ সন।
অপরদিকে একটি ভিন্ন মত প্রচলিত আছে যে, রাজা শশাঙ্ক যখন বাংলার স্বাধীন রাজা ছিলেন, তার সিঙ্গহাসনে আরোহনের বছর থেকে বঙ্গাব্দ সন প্রচলিত করেন তিনি। এটারও একটা হিসেব আছে, যেমন; রাজা শশাঙ্ক সিংহাসনে আরোহণ করেন ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দে। সেই হিসীবে ৫৯৩+১৪৩৩=২০২৬ হয়।
এখানে রাজা শশাঙ্কের বিষয়টা ঐতিহাসিকভাবে বস্তুনিষ্ঠ মনেহয় হয়। ওই সময়ের ঘটনা লিপিবদ্ধ না থাকায় এবং মুসলিম শাসকরা হিজরী ক্যালেন্ডারের প্রচলন করায় বঙ্গাব্দ চাপা পড়ে যায়। পরে সম্রাট আকবর যখন দেখেন যে হিজরী সনের সাথে ফসলের মৌসুম মেলে না, প্রতি বছর ১০ দিন করে কমতে কমতে ফসলের প্রধান মৌসুমের দিন তারিখ ঠিক রাখা যায় না, যার ফলে কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ে বিঘ্ন ঘটে। ফলে বাধ্য হয়ে সম্রাট আকবর পুনরায় বাংলা সন চালু করেন।
বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাকঃ
আকবরের সংস্কার: প্রয়োজন থেকে প্রবর্তন
১৫৫৬ সালে সিংহাসনে বসার পর আকবর একটি বড় সমস্যার মুখোমুখি হন। তখন প্রশাসনিক কাজ পরিচালিত হতো হিজরী সন অনুযায়ী, যা সম্পূর্ণ চন্দ্রভিত্তিক। ফলে প্রতি বছর প্রায় ১০–১১ দিন কমে যেত, এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে এর কোনো সামঞ্জস্য থাকতো না।
ফলাফল ছিল স্পষ্ট—
বৈশাখের ফসল কখনো কার্তিকে গিয়ে পড়তো, কর আদায় বিশৃঙ্খল হয়ে যেতো।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য আকবর “ফসলি সন” চালু করেন, যা সূর্যভিত্তিক এবং কৃষির মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এখান থেকেই বর্তমান বাংলা সনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপের সূচনা।
শশাঙ্কের সময়কাল: সম্ভাব্য শিকড়
অন্যদিকে, শশাঙ্ক (শাসনকাল ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু) ছিলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজাদের একজন। তার শাসনামলে একটি আঞ্চলিক সন চালু হয়েছিল—এমন ধারণা একেবারে অমূলক নয়।
লেখার প্রথম দিকে দেখনো গাণিতিক সামঞ্জস্য ইঙ্গিত দেয় যে বাংলা সনের মূল সূচনা সম্ভবত সেই সময় থেকেই।
প্রাচীন ভারতে রাজারা নিজেদের শাসনামলকে ভিত্তি করে সন চালু করতেন—এটি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। সুতরাং শশাঙ্কও এমন একটি সন চালু করে থাকতে পারেন, যা পরে লোকজ জীবনে টিকে ছিল।
দ্বন্দ্ব নয়, সমন্বয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—
তাহলে কি আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তক, নাকি শশাঙ্ক?
বাস্তবতা সম্ভবত মাঝামাঝি।
(১) শশাঙ্কের সময় থেকে বাংলায় একটি কৃষিভিত্তিক বা লোকজ সন প্রচলিত ছিল
(২) মুসলিম শাসনামলে হিজরী সনের প্রাধান্যে তা আড়ালে চলে যায়
(৩) পরে প্রশাসনিক প্রয়োজনেই আকবর সেই পুরনো ধারনাকে পুনপ্রবর্তন করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন
অর্থাৎ, আকবর নতুন করে কিছু সৃষ্টি করেননি—বরং একটি বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সংস্কার ও কার্যকর করেছেন।
ইতিহাসের নীরবতা ও বাস্তবতা
শশাঙ্কের সময়কার বিস্তারিত নথি আজ খুব বেশি পাওয়া যায় না। ফলে তার সঙ্গে বাংলা সনের সম্পর্ক সরাসরি প্রমাণ করা কঠিন। কিন্তু ইতিহাসের একটি বাস্তব দিক হলো—সবকিছুই লিখিত থাকে না।
লোকজ সংস্কৃতি, কৃষির সময়চক্র, মৌখিক ঐতিহ্য—এসব অনেক সময় লিখিত ইতিহাসের বাইরে থেকেও টিকে থাকে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, শশাঙ্ক-উৎস তত্ত্বটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পরিশেষে এই উপসংহারে আসা যায় যে, বাংলা সনের উৎপত্তি একক কোনো ঘটনার ফল নয়—এটি একটি ধারাবাহিক বিবর্তনের ফল। এর শিকড় সম্ভবত প্রাচীন বাংলায়, শশাঙ্কের সময়কাল বা তারও আগে থেকে। আর আধুনিক রূপ পেয়েছে সম্রাট আকবর-এর প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে।
সুতরাং সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো:
বাংলা সনের জন্ম প্রাচীন বাংলার মাটিতে, আর তার পুনর্জন্ম ঘটেছে মুঘল দরবারে। এই সমন্বিত ব্যাখ্যাই ইতিহাস, যুক্তি ও বাস্তবতার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আরও পড়ুনঃ দ্বিজাতি তত্ত্ব থেকে রাষ্ট্রনীতি: জিন্নাহর রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবনের বৈপরীত্য







Leave a Reply