ভোলার ঘূর্ণিঝড়, ইয়াহিয়ার উদাসীনতা এবং একটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনের দলিল
১৯৭০ সালের ভয়াবহ ভোলা ঘূর্ণিঝড় শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না; এটি ছিল শাসকগোষ্ঠীর নির্মম উদাসীনতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, অসংখ্য পরিবারের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া—সবকিছুর মাঝেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তার আচরণ ইতিহাসে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন হয়ে আছে।
দৈনিক দৈনিক বণিক বার্তা-এ প্রকাশিত একটি আলোচিত লেখায় উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো ঘটনা। সেই লেখার সূত্র ধরে এবং মেজর হাফিজ-এর বর্ণনায় আমরা দেখতে পাই—মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও ক্ষমতার নিষ্ঠুর অগ্রাধিকার কেমন হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের পর পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো পরিণত হয়েছিল এক বিশাল মৃত্যুপুরীতে। চারদিকে লাশ, ধ্বংসস্তূপ, আর্তনাদ—এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল ত্রাণ, উদ্ধার এবং পুনর্বাসন। কিন্তু সেই সময়ের পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান-এর অগ্রাধিকার ছিল ভিন্ন।
একটি দৃশ্য, যা পুরো ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করে
উল্লেখ্য, বেশ কয়েক বছর আগে, মতিউর রহমান চৌধুরী সম্পাদিত ‘মানব জমিন’ পত্রিকায় ভোলা ঘূর্ণিঝড় এলাকায় ইয়াহিয়া খানের পরিদর্শন নিয়ে মেজর হাফিজের একটি নিবন্ধ পড়ার সুযোগ হয়েছিল এই প্রবন্ধের লেখকের। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন—
তখন তিনি লেফটেন্যান্ট পদবীতে যশোর সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে তাঁকে ভোলা ঘূর্ণিঝড় কবলিত এলাকায় ইয়াহিয়া খানের পরিদর্শন উপলক্ষে দায়িত্বে পাঠানো হয়।
ইয়াহিয়া খানের হেলিকপ্টার যখন ভোলায় অবতরণ করে, তখন দুর্গত এলাকার মানুষজন ‘কোনো সাহায্য এসেছে’—এই আশায় হেলিকপ্টারের দিকে ছুটে আসে। কিন্তু ইয়াহিয়া খান হেলিকপ্টার থেকে নেমে আশপাশে না গিয়েই মাত্র কয়েক মিনিট অবস্থান করে পুনরায় হেলিকপ্টারে উঠে চলে যান।
কোনো ধরনের সাহায্য না পেয়ে হতাশ, বিমর্ষ মানুষগুলো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই স্তব্ধতার মাঝেই জনতার ভিড় থেকে একজন অস্ফুট স্বরে স্থানীয় ভাষায় বলে ওঠে—
“হালারা কারা!”
মেজর হাফিজ এই কথাটি নিজের কানে শুনেছিলেন—যা সেই মুহূর্তের বেদনা, ক্ষোভ ও বঞ্চনার এক গভীর প্রতিধ্বনি হয়ে আছে।
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও হুইস্কি
মেজর হাফিজের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ভোলার সেই বিপর্যস্ত পরিবেশেও ইয়াহিয়া খানের জন্য হুইস্কি জোগাড় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ভাবা যায়—একদিকে মানুষ পানির জন্য হাহাকার করছে, খাবারের জন্য মরিয়া; অন্যদিকে রাষ্ট্রপ্রধানের বিলাসিতার চাহিদা পূরণে প্রশাসন ব্যস্ত!
এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পুরো শাসনব্যবস্থার মানসিকতার প্রতিফলন।
এই ঘটনাগুলো আমাদের কী শেখায়
প্রথমত, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের গভীর অবহেলা। ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের পর ত্রাণ তৎপরতায় যে ধীরগতি ও উদাসীনতা দেখা যায়, তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিল না—এটি ছিল রাজনৈতিক বৈষম্যের ফল।
দ্বিতীয়ত, শাসকশ্রেণির নৈতিক দেউলিয়াত্ব। যখন একটি জাতি মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, তখন তাদের নেতা ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসে নিমগ্ন—এটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার চিত্র হতে পারে না।
তৃতীয়ত, এই ঘটনাগুলোই পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে তোলে। ভোলার ঘূর্ণিঝড়, তার পরবর্তী অবহেলা, এবং এমন অমানবিক আচরণ—সবকিছু মিলে বাঙালির মনে একটাই প্রশ্ন জাগায়:
“এই রাষ্ট্র কি আমাদের?”
ইতিহাসের বিচারে, এই প্রশ্নের উত্তরই পরবর্তীতে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।
বর্তমানের জন্য সতর্কবার্তা
আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে এই ঘটনাগুলো শুধুই অতীতের গল্প নয়। এগুলো আমাদের সতর্ক করে—রাষ্ট্রক্ষমতা যখন জনগণের কষ্ট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন সেটি কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
যে কোনো সরকার বা নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব মানুষের পাশে থাকা—না হলে ইতিহাস আবারও কঠিন ভাষায় বিচার করবে।
শেষ কথা
ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও হুইস্কি জোগাড়ের সেই ঘটনা শুধু একটি কাহিনী নয়; এটি ক্ষমতার নির্মমতা, অমানবিকতা এবং একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রব্যবস্থার স্থায়ী প্রতীক।
আরও পড়ুনঃ ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না: পলাশীর ১০ বিশ্বাসঘাতকের মর্মান্তিক শেষ পরিণতি







Leave a Reply