বাংলাদেশকে আমরা প্রায়ই “সম্প্রীতির দেশ” হিসেবে তুলে ধরি। রাষ্ট্রীয় ভাষণ, টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন কিংবা উৎসবকেন্দ্রিক প্রচারণায় বারবার বলা হয়—“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই শ্লোগান কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকলে সমাজে প্রকৃত সম্প্রীতি গড়ে ওঠে না। সম্প্রীতি তৈরি হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আইনের ন্যায্য প্রয়োগ এবং সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে।
সম্প্রতি একটি বিলবোর্ডে হিন্দু সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে গরুর মাংস খাওয়ার দাওয়াত দেয়ার ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকেই এটিকে নিছক “মজা” বা “ট্রল” হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোনো ধর্মীয় অনুভূতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্রূপ করা কি সত্যিই কৌতুকের বিষয়? একটি সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, সংস্কার বা ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে আঘাত করে সমাজে কখনো সুস্থ সহাবস্থান তৈরি করা যায় না।
বাংলাদেশের সাধারণ মুসলিমদের বড় একটি অংশ বাস্তবে অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার মানুষ। তারা প্রতিবেশী হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টানদের সঙ্গে স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক বজায় রেখেই জীবন কাটান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সমাজের একাংশে কিছু অশিক্ষিত ও উগ্র বক্তা ধর্মকে ব্যবহার করে ঘৃণা ছড়ানোর কাজ করছে। ধর্মীয় জ্ঞানের পরিবর্তে বিদ্বেষকে তারা বেশি প্রচার করছে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও বিভাজন ও অবিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর আইনি পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। রাষ্ট্র যদি দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে বিশ্বাস হারায়। অপরাধীরা মনে করে তারা দায়মুক্তি পেয়ে যাবে। আর ভুক্তভোগী সম্প্রদায় মনে করে, তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্র যথেষ্ট আন্তরিক নয়।
আমাদের সমাজে একটি বিপজ্জনক দ্বৈত মানসিকতাও কাজ করে। এক সম্প্রদায়ের অনুভূতিতে আঘাত লাগলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, কিন্তু অন্য সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে অনেকেই সেটিকে হালকা করে দেখেন। এই দ্বিচারিতা দীর্ঘমেয়াদে কেবল বিভাজনই বাড়ায়। ধর্মীয় সহনশীলতা মানে নিজের বিশ্বাসকে ভালোবাসার পাশাপাশি অন্যের বিশ্বাসকেও সম্মান করা।
বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কখনো সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে সমর্থন করে না। এই ভূখণ্ডে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেছে। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি সেই সম্পর্ককে দুর্বল করে দিচ্ছে।
সমাধান একদিনে আসবে না। তবে কিছু বিষয় জরুরি—
- ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
- শিক্ষাব্যবস্থায় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও নাগরিক মূল্যবোধ জোরদার করা।
- ধর্মীয় বক্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণাচর্চার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তি নয়, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। কারণ ভয়ের মধ্যে সহাবস্থান হয় না; সহাবস্থান হয় ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—আরও বেশি মানবিকতা, আরও বেশি শিক্ষা, এবং আরও কম বিদ্বেষ।
আরও পড়ুনঃ ইউরোপে বাড়ছে ইসলামভীতি: সহিংসতা, প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যতের শঙ্কা







Leave a Reply