সুইজারল্যান্ডের জুরিখের কাছে একটি ট্রেন স্টেশনে এক যুবক “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি দিয়ে পরপর তিনজনকে ছুরি মেরে গুরুতর আহত করেছে। এমন খবর ইউরোপীয় সমাজে আবারও আতঙ্ক ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটি বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনা কখনও শুধু অপরাধ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সেটি পুরো একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনমত তৈরির হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন অপরাধীর পরিচয়ের সঙ্গে ধর্মীয় স্লোগান যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
আজকের ইউরোপ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে একদিকে উগ্রপন্থী সহিংসতার ভয়, অন্যদিকে মুসলিমবিদ্বেষ বা ইসলামভীতির উত্থান—দুইটিই একসঙ্গে বাড়ছে। এর ফলে সাধারণ শান্তিপ্রিয় মুসলমানরাও ক্রমশ সন্দেহ, ঘৃণা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হচ্ছেন।
একটি ঘটনার দায় কি পুরো সম্প্রদায়ের?
বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটির বেশি মুসলমানের বিশাল অংশই সাধারণ, শান্তিপ্রিয় এবং আইন মেনে চলা মানুষ। তারা শিক্ষা, ব্যবসা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি—সবখানেই অবদান রাখছেন। কিন্তু কিছু উগ্র ব্যক্তি বা সংগঠনের সহিংস কর্মকাণ্ডের কারণে প্রায়ই পুরো মুসলিম সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।
এটি শুধু অন্যায়ই নয়, বরং বিপজ্জনকও। কারণ কোনো ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়কে অপরাধের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত করে ফেললে সমাজে বিভাজন বাড়ে। ইউরোপের বহু দেশে এখন “অভিবাসী বিরোধী” ও “মুসলিম বিরোধী” রাজনীতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেক রাজনৈতিক দল জনগণের নিরাপত্তা উদ্বেগকে ব্যবহার করে কঠোর অভিবাসন নীতি, মসজিদ নিয়ন্ত্রণ, হিজাববিরোধী অবস্থান কিংবা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নজরদারি বৃদ্ধির দাবি তুলছে।
ইউরোপের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা
গত এক দশকে ইউরোপে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান স্পষ্ট। ইংল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশে মুসলিম অভিবাসন ও ইসলামকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, ইউরোপের সাংস্কৃতিক পরিচয় হুমকির মুখে। আবার অন্যপক্ষ বলছে, বহুসংস্কৃতির সমাজকে ভয় ও বিদ্বেষের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কোনো হামলার ভিডিও বা খবর মুহূর্তে ভাইরাল হয়, কিন্তু সেই সঙ্গে কোটি কোটি শান্তিপ্রিয় মুসলমানের নীরব জীবনচিত্র কখনও আলোচনায় আসে না। ফলে মানুষের মনে একপাক্ষিক ধারণা তৈরি হয়।
উগ্রবাদ যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ইসলামভীতিও
একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো—উগ্রবাদ ও ইসলামভীতি একে অপরকে খাওয়ায়। উগ্রপন্থীরা চায় পশ্চিমা সমাজ মুসলমানদের ঘৃণা করুক, যাতে মুসলিম তরুণদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও ক্ষোভ বাড়ে। আবার ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠীগুলো উগ্র হামলাগুলোকে ব্যবহার করে পুরো মুসলিম সমাজকে হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়।
ফলে মাঝখানে আটকে যায় সাধারণ মানুষ।
যদি কোনো সমাজে একজন মুসলমানকে তার নাম, পোশাক বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সবসময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তাহলে সেই সমাজে আস্থা ও সহাবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। একইভাবে, ধর্মের নামে সহিংসতা চালানোও ইসলামের ভাবমূর্তিকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
“জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক”
এই বাক্যটি শুধু বৌদ্ধ ধর্মের একটি মানবিক প্রার্থনা নয়; এটি সভ্যতার জন্য একটি প্রয়োজনীয় দর্শন। পৃথিবী আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ঘৃণা দিয়ে ঘৃণাকে থামানো যাচ্ছে না। প্রয়োজন সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, কিন্তু একইসঙ্গে নিরপরাধ মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা।
কোনো অপরাধী মুসলমান হলে তার বিচার হবে আইন অনুযায়ী। কিন্তু তার অপরাধের দায় কোটি মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাত ডেকে আনতে পারে।
মানবসভ্যতার ইতিহাস দেখিয়েছে—যখন কোনো জনগোষ্ঠীকে একত্রে “সমস্যা” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজই।
তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—উগ্রবাদকে প্রত্যাখ্যান করা, একইসঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও ঘৃণার রাজনীতিকেও না বলা।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ যদি মানুষকেই ভয় পেতে শুরু করে, তাহলে সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরাজয় সেখানেই।
আরও পড়ুনঃ
১। দ্বিজাতি তত্ত্ব থেকে রাষ্ট্রনীতি: জিন্নাহর রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবনের বৈপরীত্য
২। ধর্মচিন্তা।লোকধর্ম: মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও জীবনের সহজ ধর্মচর্চা







Leave a Reply