ইরানকে ঘিরে বহুদিন ধরেই একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়— “এক ঘন্টার বিয়ে”। কেউ একে বলেন “মুতা বিয়ে”, কেউ বলেন “সিগেহ”। অনেকের কাছে এটি ইসলামী আইনের একটি বিশেষ বিধান। আবার অনেকে এটিকে নারীর শোষণের একটি সামাজিক কাঠামো বলে সমালোচনা করেন।
বাস্তবে বিষয়টি কী? এটি কি সত্যিই এক ঘন্টার জন্য বিয়ে? এর ধর্মীয় ভিত্তি কোথায়? ইরানি সমাজে এর প্রভাব কী? — এসব নিয়েই আজকের আলোচনা।
মুতা বা সিগেহ কী?
শিয়া ইসলামী আইন অনুযায়ী বিয়ে দুই ধরনের হতে পারে—
১। স্থায়ী বিয়ে
২। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিয়ে বা “মুতা” বিয়ে
শিয়া ফিকহে বলা হয়, এই অস্থায়ী বিয়েতে সময় আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে— এক ঘণ্টা, একদিন, একমাস, একবছর বা তারও বেশি হতে পারে।
এই কারণেই জনপ্রিয় আলোচনায় “এক ঘন্টার বিয়ে” কথাটি এসেছে।
ইরানে এই প্রথাকে সাধারণত “সিগেহ” বলা হয়।
কীভাবে এই বিয়ে সম্পন্ন হয়?
শিয়া আইনের মতে, শুধু ছেলে-মেয়ের সম্মতি যথেষ্ট নয়। একটি নির্দিষ্ট চুক্তি বা আকদ পাঠ করতে হয় এবং মোহরানা নির্ধারণ করতে হয়।
এই চুক্তিতে সাধারণত তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
- কতদিনের জন্য সম্পর্ক হবে
- মোহরানা কত হবে
- উভয় পক্ষের সম্মতি
সময় শেষ হলে সম্পর্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায়। আলাদা তালাকের প্রয়োজন হয় না।
কেন এই প্রথা চালু হয়েছিল?
শিয়া আলেমদের একটি অংশের মতে, ইসলামের শুরুর যুগে যুদ্ধ, দীর্ঘ সফর ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে এই ব্যবস্থার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
তাদের দাবি, এটি ব্যভিচার কমানোর জন্য একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ছিল।
অন্যদিকে সুন্নি ইসলামের চারটি প্রধান মাজহাব সাধারণভাবে মনে করে, ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে সাময়িক অনুমতি থাকলেও পরে এটি নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
এ কারণেই মুতা বিয়ে নিয়ে সুন্নি ও শিয়া মতবাদের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
কুরআনের কোন আয়াত থেকে মুতা বিয়ের ধারণা এসেছে?
মুতা বিয়ের সমর্থনে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয় সুরা নিসা, আয়াত ২৪। আয়াতের একটি অংশে বলা হয়েছে:
“…ফামাসতামতাতুম বিহি মিনহুন্না ফা-আতুহুন্না উজুরাহুন্না ফারিদাহ…”
অর্থাৎ: “তোমরা তাদের থেকে যে উপভোগ লাভ করবে, তাদের নির্ধারিত প্রাপ্য প্রদান করো।”
“এতদ্ব্যতীত তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে অন্যান্য নারীদের; তোমরা স্বীয় ধনের দ্বারা ব্যভিচারের উদ্দেশ্য ব্যতীত বিবাহ করার জন্য তাদের অনুসন্ধান কর; অনন্তর তাদের দ্বারা যে ফল ভোগ করবে তজ্জন্য তাদেরকে তাদের নির্ধারিত দেয় প্রদান কর এবং কোন অপরাধ হবেনা যদি নির্ধারণের পর তোমরা পরস্পর সম্মত হও, নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাজ্ঞানী, বিজ্ঞানময়”।
শিয়া তাফসিরে “ইস্তামতা” শব্দটিকে সাময়িক বৈবাহিক সম্পর্ক বা মুতা বিয়ের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এ কারণে অনেক শিয়া আলেম এই আয়াতকে মুতা বিয়ের কুরআনিক ভিত্তি হিসেবে দেখান।
তবে সুন্নি আলেমদের বড় অংশের মতে, এই আয়াত স্থায়ী বিবাহ সম্পর্কেই নাজিল হয়েছিল এবং মুতা বিয়ে পরবর্তীতে হাদিসের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়।
Bottom of Form
ইরানে এর বাস্তব চিত্র
আইনগতভাবে ইরানে সিগেহ বৈধ। তবে বাস্তব সমাজে এটি নিয়ে প্রবল বিতর্ক রয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ:
- অনেক দরিদ্র নারী অর্থনৈতিক চাপে এতে জড়ান
- কিছু ক্ষেত্রে এটি “ধর্মীয় বৈধতার আড়ালে যৌন শোষণ”
- সম্পর্ক শেষ হলে নারী ও সন্তানের সামাজিক নিরাপত্তা কমে যায়
- পুরুষতান্ত্রিক সুবিধা বেশি থাকে
অনেক মানবাধিকারকর্মী মনে করেন, এটি নারীদের জন্য অসম সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি করে।
অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি:
- এটি অবৈধ সম্পর্কের চেয়ে “ধর্মীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত”
- উভয় পক্ষের সম্মতিতে হয়
- কিছু বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য এটি সামাজিক নিরাপত্তা দিতে পারে
অর্থাৎ একই প্রথাকে কেউ দেখেন ধর্মীয় সমাধান হিসেবে, আবার কেউ দেখেন সামাজিক সংকট হিসেবে।
সব শিয়াই কি এটি সমর্থন করেন?
না। বাস্তবে বহু শিয়া মুসলমানও মুতা বিয়েকে অপছন্দ করেন বা ব্যক্তিগতভাবে অনুসরণ করেন না। অনলাইন আলোচনাগুলোতেও দেখা যায়, শিয়া সমাজের মধ্যেই এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
অনেকে মনে করেন, তাত্ত্বিকভাবে বৈধ হলেও আধুনিক সমাজে এটি অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।
ইসলামী বিশ্বে বিতর্ক কেন এত বেশি?
মুতা বিয়ে নিয়ে বিতর্কের মূল কারণ হলো:
- কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা ভিন্নতা: শিয়া ও সুন্নি আলেমরা একই বিষয়কে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন।
- নৈতিক প্রশ্ন: স্বল্প সময়ের সম্পর্ক কি সত্যিকারের বিবাহের উদ্দেশ্য পূরণ করে?
- নারীর অধিকার: পুরুষ ও নারীর সামাজিক অবস্থান কি এতে সমান থাকে?
- ধর্ম বনাম সামাজিক বাস্তবতা: ধর্মীয় অনুমতি থাকলেও আধুনিক সমাজে এর প্রভাব কেমন?
“এক ঘন্টার বিয়ে” — বাস্তবতা না অতিরঞ্জন?
আসলে “এক ঘন্টার বিয়ে” কথাটি পুরোপুরি মিথ্যা নয়, কারণ শিয়া ফিকহে খুব স্বল্প সময়ের জন্যও মুতা চুক্তি করা সম্ভব বলে উল্লেখ আছে।
তবে এটিকে শুধু “ঘন্টার বিয়ে” বলে উপস্থাপন করলে পুরো বিষয়টি সরলীকৃত হয়ে যায়। কারণ এর পেছনে রয়েছে:
- দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিতর্ক
- সুন্নি-শিয়া মতপার্থক্য
- সামাজিক বাস্তবতা
- ধর্মীয় ব্যাখ্যার সংঘাত
- নারী অধিকার প্রশ্ন
উপসংহার
ইরানের “এক ঘন্টার বিয়ে” বা সিগেহ শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়; এটি একই সঙ্গে ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি, নৈতিকতা ও নারী অধিকারের জটিল আলোচনার অংশ।
কেউ একে ইসলামী আইনের বৈধ কাঠামো মনে করেন, কেউ দেখেন আধুনিক সমাজে একটি বিতর্কিত ও শোষণমূলক ব্যবস্থা হিসেবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— এই প্রথাকে বুঝতে হলে শুধু আবেগ নয়, ইতিহাস, ধর্মীয় মতপার্থক্য এবং বাস্তব সামাজিক প্রভাব— সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তবে প্রচার যাইই থাকুক, ইরানে অবৈধ যৌনাচার যেমন সহজ নয়, মুতা বিয়েো ততটা সহজলভ্য নয় বলেই মনে হয়।
৩৩ বছর আগে (১৯৯৩ সালে) এই নিবন্ধ লেখকের কয়েকজন ইরানীর সাথে কথা হয়েছিলো, দক্ষিণ কোরিয়ায়। তাদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে আলাপচারিতায় জানা যায়, তারা সস্তায় নারী সম্ভোগের উদ্দেশ্যে ফিলিপাইন গিয়েছিলো। সেখান থেকে কোরিয়া যায়।
আরও পড়ুনঃ ধর্ম অবমাননা আসলে কী?







Leave a Reply