“মুসলিম” শব্দটি আজ অনেকেই শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে দেখেন। কিন্তু কুরআনের ভাষায় “মুসলিম” মানে হলো—যে ব্যক্তি এক আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, তাঁর নির্দেশ মেনে চলে এবং সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই অর্থে প্রশ্ন আসে—দুনিয়ার প্রথম মুসলিম আসলে কে?
কুরআনের বিভিন্ন আয়াত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, “প্রথম মুসলিম” কথাটি কেবল একজন ব্যক্তিকে বোঝাতে ব্যবহার হয়নি; বরং এটি ছিল আনুগত্য, আত্মসমর্পণ ও ঈমানের এক ধারাবাহিক অবস্থান।
“আমি প্রথম মুসলিমদের একজন”
কুরআনে একাধিক নবীকে “প্রথম মুসলিম” বা “প্রথম আত্মসমর্পণকারী” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ—
আল-কোরআন — সুরা আনআম ৬:১৬৩
“তিনি আমার কোনো শরীক নন। আমাকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমিই প্রথম মুসলিম।”
এখানে নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-কে বলা হয়েছে তিনি “প্রথম মুসলিম”। এর মানে কি তাঁর আগে কেউ মুসলিম ছিলেন না? অবশ্যই ছিলেন। কারণ কুরআন নিজেই বলে ইবারহীম, মুসা, সূহ সহ বহু নবী আল্লাহর অনুগত ছিলেন।
তাহলে এখানে “প্রথম মুসলিম” বলতে বোঝানো হয়েছে—নিজ জাতি, নিজ সময় বা নিজ উম্মতের মধ্যে প্রথম আত্মসমর্পণকারী।
ইবরাহিম (আ.) কি প্রথম মুসলিম?
সুরা বাকারা ২:১৩২
“ইবরাহিম তাঁর সন্তানদের এ উপদেশ দিয়েছিলেন এবং ইয়াকুবও—‘হে আমার সন্তানরা! আল্লাহ তোমাদের জন্য এ দ্বীন মনোনীত করেছেন। অতএব তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’”
এই আয়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে দেখা যাচ্ছে, ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর সন্তানদের “মুসলিম” হয়ে থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন। অর্থাৎ ইসলাম শুধু নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সময় থেকে শুরু হয়নি; বরং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের এই ধারাই ছিল সকল নবীর শিক্ষা।
আরেক জায়গায় কুরআনে বলা হয়েছে—
“যখন তাঁর প্রতিপালক বললেন, আত্মসমর্পণ করো, তখন তিনি বললেন—আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।”
এখানে ইবরাহিম (আ.)-এর আত্মসমর্পণকে ইসলামের মূল পরিচয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আদম (আ.) কি প্রথম মুসলিম?
যদি “মুসলিম” শব্দের প্রকৃত অর্থ ধরা হয়—আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারী—তাহলে মানবজাতির প্রথম মুসলিম ছিলেন আদম (আঃ)। কারণ তিনিই প্রথম মানুষ এবং আল্লাহর নির্দেশ মান্যকারী প্রথম মানব।
সুরা তহা ২০:১১৫
“আমি পূর্বে আদমের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন…”
এই আয়াতে আদম (আঃ)-এর সঙ্গে আল্লাহর সরাসরি সম্পর্ক, নির্দেশ এবং আনুগত্যের প্রসঙ্গ এসেছে। তিনি ভুল করেছিলেন, কিন্তু পরে তওবা করেন এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসেন। অর্থাৎ আত্মসমর্পণের পথ মানবজাতির শুরু থেকেই ছিল।
নূহ (আ.ঃ)-ও নিজেকে মুসলিম বলেছেন
কুরআনে নুহ (আঃ) বলেন—
“আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হই।”
এতে বোঝা যায়, ইসলাম কোনো নতুন ধর্ম নয়; বরং সব নবীর একই মূল আহ্বান—এক আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য।
সুরা আরাফ ও মানবজাতির আদি প্রতিশ্রুতি
কোরআন-এর সুরা আরাফে আল্লাহ বলেন যে তিনি আদম সন্তানের কাছ থেকে সাক্ষ্য নিয়েছিলেন—
“আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?”
তারা বলেছিল, “হ্যাঁ, অবশ্যই।”
এই আয়াত থেকে অনেকে বলেন, মানুষের আত্মিক পরিচয় শুরু থেকেই আল্লাহর প্রতি স্বীকৃতি ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে গঠিত। অর্থাৎ ইসলামের বীজ মানবসত্তার মধ্যেই নিহিত।
কুরআন সহজ করে দেওয়া হয়েছে
সুরা কামার ৫৪:১৭
“আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?”
এই আয়াত আলোচনার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। কারণ কুরআন মানুষকে জটিল পরিচয়ের ভেতর নয়, বরং মূল সত্যে ফিরতে আহ্বান করে—আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ। “মুসলিম” পরিচয়ের মর্মও সেখানেই।
তাহলে প্রথম মুসলিম কে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে “মুসলিম” শব্দটিকে কীভাবে বোঝা হচ্ছে তার উপর।
- যদি বর্তমান উম্মতের প্রসঙ্গে বলা হয়, তবে নবী মূহাম্মদ (সাঃ) তাঁর জাতির মধ্যে প্রথম মুসলিম।
- যদি নবীদের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করা হয়, তবে ইব্রাহীম (আঃ) নিজেকে মুসলিম হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং তাঁর বংশধরদেরও মুসলিম থাকতে বলেছেন।
- আর যদি মানবজাতির সূচনা থেকে বিচার করা হয়, তবে প্রথম মানুষ আদম (আঃ)-ই ছিলেন প্রথম মুসলিম—কারণ তিনিই প্রথম আল্লাহর নির্দেশপ্রাপ্ত ও তাঁর কাছে আত্মসমর্পণকারী মানুষ।
উপসংহার
কুরআনের দৃষ্টিতে ইসলাম কোনো নতুন ধর্ম নয়, বরং মানবজাতির শুরু থেকেই চলে আসা এক চিরন্তন সত্য—এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ। তাই “প্রথম মুসলিম” বলতে কেবল একটি ঐতিহাসিক নাম খোঁজা যথেষ্ট নয়; বরং বুঝতে হবে, মুসলিম হওয়া মানে সত্য ও স্রষ্টার কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া।
এই অর্থে আদম (আঃ) থেকে শুরু করে নূহ (আঃ), ইবরাহিম (আঃ), মূসা (আঃ), ঈসা (আঃ) এবং মুহাম্মদ (সাঃ)—সব নবীই ছিলেন মুসলিম, কারণ তারা সবাই একই আহ্বান নিয়ে এসেছিলেন:
মানুষ যেন এক আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করে এবং অহংকারের বদলে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেয়।







Leave a Reply