বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কারো মতে এটি রাজনৈতিক পালাবদল, কারো মতে প্রশাসনিক পরিবর্তন, আবার কারো মতে এটি মতাদর্শিক এক নতুন ঢেউ। অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এটিকে শুধু “অস্থায়ী সরকার” বা “সংস্কার” বলেই থামছেন না—তারা এটিকে সতর্কতামূলকভাবে দেখছেন।
এ লেখায় আমি আমেরিকার বিখ্যাত বিশ্লেষক, American Enterprise Institute–এর সিনিয়র ফেলো ও প্রাক্তন পেন্টাগন কর্মকর্তা মাইকেল রুবিন বাংলাদেশের বর্তমান সংকটকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা তুলে ধরছি।
এরপরের অংশ মাইকেল রুবিন-এর বক্তব্যের সারমর্ম, বিশ্লেষণ এবং যুক্তির হুবহু বর্ণনা।
“বাংলাদেশ এখন এমনভাবে বদলাচ্ছে, যা আমাকে ১৯৭৯ সালের ইরানের কথা মনে করিয়ে দেয়”
রুবিন দেখছেন—একটি সরকার পতনের মুহূর্তকে সাধারণত অনেকে ‘মুক্তি’র সূচনা মনে করেন। কিন্তু ক্ষমতার শূন্যতা যখন সৃষ্টি হয়, তখন সবচেয়ে সংগঠিত গোষ্ঠীই দ্রুত রাষ্ট্রযন্ত্র দখল করে নেয়।
ইরানে ঠিক এমনটাই হয়েছিল।
আজ তিনি বাংলাদেশেও সেই কাঠামোগত মিল দেখছেন।
বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেই জায়গায় সবচেয়ে দ্রুত, সবচেয়ে সংগঠিত এবং সবচেয়ে আদর্শিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে ইসলামপন্থি গোষ্ঠী—যাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা খুবই সুগঠিত।
“ইরানের শাহের পতনের পর গণতন্ত্র আসেনি—ক্ষমতা দখল করেছে সংগঠিত ধর্মীয় নেতৃত্ব”
রুবিন বলেন—ইরানের বিপ্লব গণমুখী ছিল, কিন্তু নেতৃত্ব দখল করেছে তারা, যারা সবচেয়ে সংগঠিত এবং আদর্শিকভাবে প্রস্তুত ছিল।
বাংলাদেশেও তিনি একই প্রবণতা দেখছেন:
- ইসলামপন্থি দলগুলোর মাঠ-দখল
- প্রশাসনে অনুকূল অবস্থান অর্জন
- বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুনরুত্থান
- মিডিয়া ন্যারেটিভ দখলের চেষ্টা
- বিচারব্যবস্থা ও নিরাপত্তা খাতে নরম চাপ
এটি তাঁর কাছে ইরানের “প্রি-ইসলামিক রিপাবলিক” পর্বের হুবহু পুনরাবৃত্তির মতো।
“ইউনুস নিজে খোমেনি নন—কিন্তু তাঁর সময়ে ইসলামপন্থিদের জন্য যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটিই আসল বিপদ”
রুবিনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী:
- সামনে একজন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, নরম-ইমেজধারী নেতা
- পেছনে অতি সংগঠিত আদর্শিক গোষ্ঠী
- প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে ইসলামপন্থিদের আগ্রাসী অগ্রযাত্রা
- রাষ্ট্রযন্ত্রে ধীরে ধীরে মতাদর্শিক অনুপ্রবেশ
এই মডেলটি ইরানে প্রয়োগ হয়েছিল “সফট-ফ্রন্ট পলিটিক্স” নামে—যেখানে নরম চেহারা সামনে থাকে, কিন্তু মূল ক্ষমতা থাকে ধর্মীয়-আদর্শিক শক্তির হাতে।
রুবিন বলছেন—বাংলাদেশেও তিনি ঠিক এমনটাই দেখছেন।
“সবচেয়ে উদ্বেগজনক মিল—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও বিচার কাঠামোর দখলের কৌশল”
ইরানে বিপ্লবের পর প্রথমে দখল করা হয়েছিল:
- বিচারব্যবস্থা
- নিরাপত্তা খাত
- গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান
- বিশ্ববিদ্যালয়
- মিডিয়া
রুবিন দেখছেন—বাংলাদেশেও একই কৌশল বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপ দেখা যাচ্ছে:
- বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠিত আদর্শিক গোষ্ঠীর আগ্রাসন
- বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা
- আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মতাদর্শিক চাপ
- মিডিয়া ন্যারেটিভের পুনর্গঠন
এগুলো মিলিয়ে তাঁর মতে দেশ একটি বিপজ্জনক বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে।
“এই ধারা চলতে থাকলে—বাংলাদেশ ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ মডেলের দিকে যেতে পারে”
রুবিন বলেন—ইরানে ইসলামী রাষ্ট্র ঘোষণা হয়েছিল ধাপে ধাপে।
বাংলাদেশেও তিনি একই ‘সফট-পরিবর্তন’ দেখতে পাচ্ছেন:
- সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ
- ভয় ও ভীতি সৃষ্টি
- সংখ্যালঘুদের ওপর চাপ
- নারীর স্বাধীনতায় সংকোচ
- মতপ্রকাশ ও চিন্তার পরিসরে ভাঙন
- প্রশাসনে ধারাবাহিক অনুপ্রবেশ
রুবিনের মন্তব্য—“বাংলাদেশ যদি দ্রুত এই প্রবণতা থামাতে না পারে, তবে ইরানের মতো দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক দখলে চলে যাওয়াটা খুব কঠিন নয়।”
উপসংহার
রুবিনের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়—এটি একটি আদর্শিক রূপান্তরের প্রাথমিক ধাপ, যা সঠিকভাবে সামাল দিতে না পারলে ভবিষ্যতে দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং মুক্ত চিন্তার ওপর গুরুতর আঘাত আসতে পারে।
বাংলাদেশ এখন একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে।
রাষ্ট্রযন্ত্র রক্ষার সঠিক নীতি এখনই না নিলে—পরিণতি কয়েক দশকব্যাপী হতে পারে।
মাইকেল রুবিন
২৮ নভেম্বর ২০২৫
সূত্রঃ Firstpost
মন্তব্যঃ
“এ ধরনের আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ, রাজনৈতিক গবেষণা ও সমসাময়িক মন্তব্য পেতে ব্লগটি নিয়মিত অনুসরণ করুন।”








Leave a Reply