ইতিহাসে অনেক যুদ্ধ হয়েছে জমি, ক্ষমতা, ধর্ম বা সম্পদের জন্য। কিন্তু একটি চেয়ার—বা বলা ভালো, একটি পবিত্র আসন—কে কেন্দ্র করে যে যুদ্ধ হয়েছিলো তা আজও বিস্ময় জাগায়। এই যুদ্ধের নাম “ওয়ার অব দ্য গোল্ডেন স্টুল”। সংঘটিত হয়েছিলো ১৯০০ সালে, বর্তমান ঘানা অঞ্চলে।
‘গোল্ডেন স্টুল’ কি?
আশান্তি (Ashanti/Asante) জনগোষ্ঠীর কাছে গোল্ডেন স্টুল ছিল শুধু বসার চেয়ার নয়। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী—এই স্টুলে আশান্তি জাতির আত্মা, ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব নিহিত। এতে কখনো কেউ বসে না, রাজাও নয়, বরং জাতির প্রতীক। স্টুল হারানো মানেই জাতির আত্মা হারানো।
অর্থাৎ এটি ছিলো একটি রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় প্রতীক। আধুনিক ভাষায় বললে—জাতীয় অস্তিত্বের চিহ্ন।
আরও পড়ুনঃ বালতি চুরিকে কেন্দ্র করে যুদ্ধঃ
ব্রিটিশদের দাবি: আগুনে ঘি ঢালা
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আফ্রিকায় উপনিবেশ বিস্তার করছিল। আশান্তি রাজ্য তখনও পুরোপুরি দখল হয়নি।
১৯০০ সালে ব্রিটিশ গভর্নর স্যার ফ্রেডরিক হজসন এক সভায় ঘোষণা দেন—
“গোল্ডেন স্টুল কোথায়? আমি সেটিতে বসতে চাই।”
এই বক্তব্য আশান্তিদের কাছে ছিলো চরম অবমাননা ও রাজনৈতিক আগ্রাসন।
কারণ—গোল্ডেন স্টুলে বসার অধিকার কারও নেই। একজন বিদেশি শাসকের এমন দাবি মানে আশান্তি জাতির সার্বভৌমত্ব অস্বীকার।
বিদ্রোহের নেতৃত্বে এক নারী
এই অপমানের বিরুদ্ধে আশান্তিরা বিদ্রোহে ফেটে পড়ে। এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন এক অসাধারণ নারী—ইয়া আসান্তেওয়া (Yaa Asantewaa)। তিনি ছিলেন এজিসু এলাকার রানী-মাতা (Queen Mother)। তার বিখ্যাত আহ্বান—“যদি পুরুষেরা যুদ্ধ না করে, তবে আমরা নারীরাই করবো!” এই আহ্বানেই শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ।
যুদ্ধের রূপ
আশান্তি যোদ্ধারা ব্রিটিশ দুর্গ ঘেরাও করে। কয়েক মাস ধরে চলে সংঘর্ষ। আধুনিক অস্ত্র ও রসদের কারণে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরা জয়ী হয়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—গোল্ডেন স্টুল কখনোই ব্রিটিশদের হাতে পড়েনি
এটি গোপনে লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো জাতির সম্মান রক্ষায়।
ফলাফল ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ইয়া আসান্তেওয়া বন্দি হয়ে নির্বাসনে যান।আশান্তি অঞ্চল আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়।কিন্তু গোল্ডেন স্টুল রয়ে যায় আশান্তি জাতির প্রতীক হিসেবে।
আজও ঘানায় এই যুদ্ধকে দেখা হয়—উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক, নারী নেতৃত্বের অনন্য উদাহরণ এবং সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার ইতিহাস হিসেবে।
উপসংহার
একটি চেয়ার—কিন্তু তা ছিলো শুধু কাঠ বা সোনার নয়, তা ছিলো একটি জাতির আত্মা। এই যুদ্ধ প্রমাণ করে—’কোনো কোনো বস্তু অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী, যদি তা মানুষের পরিচয় ও সম্মানের প্রতীক হয়। ইতিহাসে তাই এটি শুধু একটি যুদ্ধ নয়— এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
আরও পড়ুনঃ এক টুকরো রুটির জন্য যুদ্ধ








Leave a Reply