ইসলামি বিশ্বে ‘ওয়াহাবি’ ও ‘সালাফি’—এই দুই শব্দ প্রায়ই একে অপরের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে গবেষক ও ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি ধারণা এক নয়। বরং ইতিহাস, কাঠামো ও প্রভাবের দিক থেকে এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিভ্রান্তি আরও প্রকট।
ওয়াহাবি ও সালাফি: মূল পার্থক্য কোথায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াহাবি ও সালাফির মধ্যে পার্থক্য বোঝার প্রথম শর্ত হলো—একটি আন্দোলন, অন্যটি চিন্তাধারা।
(১) ওয়াহাবি
- ১৮শ শতকে আরব উপদ্বীপে উদ্ভূত একটি নির্দিষ্ট সংস্কার আন্দোলন
- প্রতিষ্ঠাতা: মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব
- সৌদি রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক জোট
- রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিস্তার
(২) সালাফি
- কোনো একক প্রতিষ্ঠাতা নেই
- ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্ম (সালাফে সালেহিন) অনুসরণের দাবি
- একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যাগত পদ্ধতি
- রাষ্ট্রনির্ভর নয়, বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময়
বিশ্লেষকদের ভাষায়, সব ওয়াহাবি সালাফি হলেও, সব সালাফি ওয়াহাবি নয়।
কেন দুটোকে এক করে দেখা হয়
এই বিভ্রান্তির পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়—
(১) সৌদি আরবের মাধ্যমে সালাফি পরিচয়ের বিস্তার
(২) আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার
(৩) গণমাধ্যমে ‘সালাফি’ শব্দের অস্পষ্ট প্রয়োগ
ফলে উপমহাদেশে অনেক সময় যেকোনো কঠোর ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে “ওয়াহাবি” বা “সালাফি” বলে চিহ্নিত করা হয়।
উপমহাদেশে সালাফি চিন্তার প্রবেশ
ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশে সালাফি ঘরানার চিন্তার উপস্থিতি নতুন নয়।
১৮–১৯ শতকে—নিম্নে উল্লেখিত দুই ইসলামি চিন্তাবিদ তাওহীদ ও সংস্কারমূলক চিন্তার ওপর গুরুত্ব দেন, যা পরবর্তীতে সালাফি ব্যাখ্যার সঙ্গে মিল খুঁজে পায়।
(১) শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি
(২) সৈয়দ আহমদ শহীদ
তবে সমসাময়িক সালাফি প্রভাব মূলত বেড়েছে—
(১) মধ্যপ্রাচ্যে শ্রম অভিবাসনের মাধ্যমে
(২) সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগে
(৩) আধুনিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন দাওয়াহ কার্যক্রমে
বাংলাদেশে সালাফি প্রভাব: বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশে ইসলাম ঐতিহাসিকভাবে—হানাফি ফিকহ এবং সুফি ও পীর-মাশায়েখ কেন্দ্রিক চর্চার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সালাফি চিন্তার কিছু প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে—
(১) কিছু মসজিদ ও মাদ্রাসায় ভিন্নধর্মী ব্যাখ্যার চর্চা
(২) ধর্মীয় আচার ও সংস্কৃতির বিষয়ে কঠোর অবস্থান
(৩) বিদ‘আত ও কুসংস্কারবিরোধী প্রচার
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে সালাফি পরিচয়ধারীদের বড় অংশই শান্তিপূর্ণ ও দাওয়াহভিত্তিক। সহিংস বা চরমপন্থী ধারা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষণ ও বাস্তবতা
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন—
(১) সালাফি চিন্তাকে সরাসরি চরমপন্থার সঙ্গে এক করে দেখা ভুল ও বিপজ্জনক
(২) এতে মূলধারার শান্তিপূর্ণ ধর্মচর্চাকারীরা কলঙ্কিত হন
(৩) প্রকৃত চরমপন্থা চিহ্নিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের রাষ্ট্রগুলো বর্তমানে এই পার্থক্য বোঝার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
উপসংহার
ওয়াহাবি ও সালাফি—এই দুই ধারণা একই নয়, আবার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নও নয়।
ওয়াহাবি হলো একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক আন্দোলন, আর সালাফি হলো বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক ধর্মীয় ব্যাখ্যা কাঠামো।
বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পার্থক্য বোঝা জরুরি—কারণ বিভ্রান্তিকর সাধারণীকরণ সমাজে অপ্রয়োজনীয় ভয়, বিদ্বেষ ও বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজন হলো তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, ইতিহাসচর্চা এবং ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি—আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত নয়।
আরও পড়ুনঃ
১। সালাফি মতবাদ







Leave a Reply