ইসলামি বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত ও আলোচিত একটি পরিভাষা হলো “সালাফি”। ধর্মীয় আলোচনা থেকে শুরু করে রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ—সব ক্ষেত্রেই শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সালাফি চিন্তাকে একক কোনো আন্দোলন বা গোষ্ঠী হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র আড়াল হয়ে যায়।
সালাফি শব্দের অর্থ কী
“সালাফি” শব্দটি এসেছে “সালাফে সালেহিন” থেকে—অর্থাৎ ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্ম:
- সাহাবি
- তাবেয়ি
- তাবে-তাবেয়ি
সালাফি চিন্তার মূল বক্তব্য হলো—এই প্রাথমিক প্রজন্ম যেভাবে কুরআন ও সুন্নাহ বুঝেছেন, ইসলামকে সেভাবেই অনুশীলন করা উচিত।
কোনো একক প্রতিষ্ঠাতা নেই
অনেকে দাবি করে থাকেন সালাফি মতবাদের প্রতিষ্ঠতা নাছিরুদ্দিন আলবানী, কিন্তু তা নয়। তাহলে তিনি সালাফির “কে” ছিলেন?
তিনি ছিলেন –
সালাফি মানহাজের আধুনিক যুগের অন্যতম প্রধান আলেম, ব্যাখ্যাকার ও শক্তিশালী প্রতিনিধি।
ইতিহাসবিদদের মতে, সালাফি চিন্তার কোনো একক প্রতিষ্ঠাতা বা নির্দিষ্ট সূচনাকাল নেই। এটি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন বা সংগঠনের নাম নয়, বরং একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যাগত ধারা বা পদ্ধতি।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়িমের মতো আলেমদের চিন্তাধারাকে সালাফি ব্যাখ্যার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য
সালাফি চিন্তার কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
- কুরআন ও সহিহ হাদিসের ওপর সরাসরি গুরুত্ব
- বিদ‘আত পরিহার
- ধর্মীয় বিষয়ে অতিরিক্ত দর্শন ও কিয়াস পরিহার
- আকিদায় সরলতা ও আক্ষরিক ব্যাখ্যার প্রবণতা
সমর্থকদের মতে, এটি ইসলামের বিশুদ্ধতা রক্ষার একটি প্রয়াস।
সালাফিদের ভেতরেই বিভাজন
বিশ্লেষকদের মতে, সালাফিদের একরকম ভাবা একটি বড় ভুল। বাস্তবে এই ধারার ভেতরে একাধিক প্রবণতা রয়েছে—
- শান্ত/দাওয়াহভিত্তিক সালাফি
- শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রচারে মনোযোগী
- রাজনৈতিক সালাফি
- রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে অবস্থান নেয়
- চরমপন্থী সালাফি (জিহাদি ব্যাখ্যা)
- সহিংসতা সমর্থন করে (যা অধিকাংশ সালাফি আলেম প্রত্যাখ্যান করেন)
এই বিভাজনই সালাফি পরিচয়কে জটিল করে তুলেছে।
ওয়াহাবির সঙ্গে সম্পর্ক
গবেষকদের মতে—
- সব ওয়াহাবি নিজেদের সালাফি দাবি করে
- কিন্তু সব সালাফি ওয়াহাবি নয়
ওয়াহাবি আন্দোলন একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে, আর সালাফি চিন্তা তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত ও সময়-নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা কাঠামো।
বিতর্ক ও সমালোচনা
সালাফি চিন্তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলো হলো—
- ধর্মীয় ব্যাখ্যায় কঠোরতা
- ঐতিহ্যবাহী মাযহাব ও সুফি চর্চার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
- ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীলতার ঘাটতি
তবে সালাফি আলেমরা দাবি করেন, সহিংসতা বা চরমপন্থা তাদের মূল শিক্ষার অংশ নয়।
সমসাময়িক প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় সালাফি চিন্তার প্রভাব দৃশ্যমান। অভিবাসন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার মাধ্যমে এই ধারা দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা বিশ্লেষণে “সালাফি” শব্দটির অতিরিক্ত ও অস্পষ্ট ব্যবহারের কারণে বিভ্রান্তি বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
উপসংহার
সালাফি চিন্তা কোনো একক দল, রাষ্ট্র বা মতবাদ নয়। এটি ইসলামের একটি প্রভাবশালী ব্যাখ্যাগত ধারা—যার ভেতরে বৈচিত্র্য, মতভেদ ও বিতর্ক রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সালাফি পরিচয় বোঝার জন্য প্রয়োজন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ভেতরের বিভাজন ও বাস্তব চর্চাকে আলাদা করে দেখা।







Leave a Reply