বাংলাদেশের আদালত সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে (Tulip Siddiq) একটি দুর্নীতি মামলায় তার অনুপস্থিতিতে (in absentia) দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। রায়ে বলা হয়েছে, তিনি যুক্তরাজ্যের মন্ত্রী হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে বাংলাদেশে একটি প্লট বরাদ্দে সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু টিউলিপ ও তার ঘনিষ্ঠরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—তিনি কখনোই কোনো প্লট নেননি, বরাদ্দেও সম্পৃক্ত ছিলেন না। মামলাটি বাংলাদেশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই এসেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মামলার সংক্ষেপ
- মামলায় অভিযোগ ছিল—টিউলিপ সিদ্দিক নাকি তার পদমর্যাদা ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে প্লট বরাদ্দ পেতে সাহায্য করেছেন।
- আদালত তার অনুপস্থিতিতেই মামলার বিচার সম্পন্ন করে দুই বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করে।
- কিন্তু গোটা প্রক্রিয়ায় তাকে কোনো সমন বা নোটিশ পাঠানো হয়নি—এ অভিযোগ তুলেছেন যুক্তরাজ্যের আইনজীবীরাও।
- যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ—দুই দেশেই রাজনৈতিক অস্থিরতা চলাকালীন রায়টি দেওয়া হয়, যা প্রশ্ন তুলেছে ন্যায্যতা নিয়ে।
টিউলিপ সিদ্দিকের প্রতিক্রিয়া
টিউলিপ রায়টিকে “flawed and farcical”—ত্রুটিপূর্ণ এবং হাস্যকর—হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বক্তব্য:
- বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ কখনোই তাকে চার্জ, নোটিশ বা সমনের ব্যাপারে অবহিত করেনি।
- তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ “fabricated” এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
- তিনি বলেন, এটি প্রকৃতপক্ষে একটি “kangaroo court verdict”—যেখানে ন্যায্যতা বা প্রতিরক্ষার সুযোগ ছিল না।
ব্রিটিশ আইনজীবীদের অবস্থান
প্রসিদ্ধ ব্রিটিশ আইনজীবী—Robert Buckland KC, Cherie Blair KC এবং Dominic Grieve KC সহ একটি দল—এক যৌথ বিবৃতিতে রায়টিকে “contrived and unfair” বলে অভিহিত করেছেন। তাদের প্রধান পর্যবেক্ষণ:
- টিউলিপকে ন্যায্য প্রতিরক্ষার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি।
- তার আইনজীবীকেও যথাযথভাবে মামলায় অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগও উঠে এসেছে।
- আন্তর্জাতিকভাবে যে fair trial standards স্বীকৃত—এই বিচার তার কোনোটিই পূরণ করেনি।
- তারা বাংলাদেশকে রায় পুনর্বিবেচনা ও ন্যায্য শুনানির দাবি জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্য সরকারের ও সংসদ সদস্যদের প্রতিক্রিয়া
যেহেতু টিউলিপ জন্মসূত্রে যুক্তরাজ্যের নাগরিক এবং যুক্তরাজ্য–বাংলাদেশের মধ্যে কোনো কার্যকর extradition treaty নেই—এই রায় কার্যকর করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।
UK–এর কয়েকজন সংসদ সদস্য জানিয়েছেন:
- টিউলিপের বিরুদ্ধে মামলাটি অস্বাভাবিক ও প্রশ্নবিদ্ধ।
- বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রায়টির উদ্দেশ্য “সন্দেহজনক”।
- যুক্তরাজ্যে তিনি একজন নির্বাচিত এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন; বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক পরিবেশে এমন রায়ের প্রভাব খুবই সীমিত।
কেন অনেকে মামলাটিকে ‘হাস্যকর’ বলছেন
বিশেষজ্ঞদের মতে:
- যে প্লট বরাদ্দের অভিযোগ টিউলিপের বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে—সেখানে তিনি আদৌ কোনো সুবিধাভোগী ছিলেন না।
- অভিযোগের যৌক্তিক ভিত্তি দুর্বল; কোনো অর্থ লেনদেন বা ব্যক্তিগত লাভের প্রমাণ নেই।
- তার খালা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন—তাই যুক্তরাজ্যের একজন জুনিয়র মন্ত্রীর প্রভাব খাটানোর অভিযোগ বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক।
- রাজনৈতিক উত্থান–পতনের মুহূর্তে এমন রায়কে অনেকেই “high-profile scapegoating” হিসেবে দেখছেন।
উপসংহার
টিউলিপ সিদ্দিকের রায় নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে—তা মূলত বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ন্যায্যতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্বচ্ছতা নিয়ে বিস্তৃত প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে।
তিনি যুক্তরাজ্যে জনপ্রিয় সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং রায়টির বাস্তবিক প্রভাব খুব কম হলেও বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি আলোচনার সূচনা করেছে। বৃটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা The Guardean বলেছে, এই রায়ে যুক্তরাজ্য-বাংলাদেশ কুটনৈতিক সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্রঃ The Guardean, Reuter








Leave a Reply