যদি “শান্তি” মানে হয় বোমা মারার ধাক্কায় যুদ্ধ বন্ধ করা, দেশের সীমান্ত দখল, জনসংখ্যা বিতাড়ন আর ক্ষমতার অহংকার দিয়ে বৈশ্বিক দৃশ্যমানতা অর্জন করা — তাহলে, বোধ হয় ট্রাম্প সত্যিই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছিলেন, এবং আজও তিনি সেই “অসামান্য শান্তির পুরস্কারপ্রাপ্ত” নেতা।
আবাসিক হোয়াইট হাউস থেকে বের হয়েছে শুধু এক-একটি ঘোষণা, আর তা ছিল নির্বাচনের আগে প্রচারের অংশ। কিন্তু এখন, যখন গাজা রণক্ষেত্র থেকে ইউক্রেনের ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরগুলোর ধোঁয়ার উপরে ট্রাম্প আবারও ধ্যান দিচ্ছেন, বোঝা যায় — শান্তির নাম আর অর্থিক লাভের খেলা আজ তিনি সম্পূর্ণ দখলে নিয়েছেন।
যুদ্ধ বন্ধ নয়, যুদ্ধ “ব্রোকার” হিসেবে প্রশংসিত
ট্রম্পের যদি শান্তির সবচেয়ে বড় “অর্জন” খুঁজে বের করতে হয়, তা হবে মাইনের মতো যুদ্ধ এনে দেওয়া — এবং শেষে সে যুদ্ধ বন্ধ করে দেওয়া। গাজায় হামাস ও ইসরায়েল যুদ্ধে দুই বছর ধরে রক্তপাত চলছিল; ট্রাম্প মাছ ধরার মত তখনই আহ্বান জানালেন, যখন যুদ্ধ যেন তার ভোটব্যাঙ্ক বাড়াতে সাহায্য করে।
তিনিই মধ্যস্থতা করেন, তারপরই ভোগ দায় নিয়ে ঘোষণা করেন — যা ‘শান্তির চুক্তি’। কিন্তু সেই চুক্তি কি গাজার জনগণের জন্য শান্তি এনেছে? না। বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য? হাঁ, অবশ্যই। যুক্তরাষ্ট্রের মহান ‘রক্তপিপাসু’ ট্রাম্প তখন থেকেই ‘শাস্তি একজন শান্তির মহানায়কের নাম’ হিসেবে সমাদৃত হতে শুরু করেন।
জনসংখ্যা বাস্তবায়ন আর ‘নিউ–মিডল ইস্ট রিভিয়েরা’
ট্রম্প পরামর্শ দিয়েছেন — গাজা উপত্যকাকে পুনর্গঠন করে “মিডল ইস্ট অর্থনীতির রিভিয়েরা (ভূমধ্যসাগরীয় তটভূমি অঞ্চল)” বানানো উচিত। অর্থাৎ, স্থানীয় মানুষের শিকলে ধরা, অপবাসন করা, আবার নতুন বিনিয়োগ দিয়ে তা সমৃদ্ধ দেখানো — এই সংমিশ্রণই তাঁর “শান্তির আদর্শ”।
এই ভয়ঙ্কর ধারণা নিশ্চয়ই একটি শান্তি পুরস্কারের মতো নয় — বরং এটি সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশবাদের নবায়ন। কিন্তু যদি শান্তিকে “দেশ দখল করে পুনর্নির্মাণ” হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে ট্রাম্প হলো নোবেল ইতিহাসের সবচেয়ে “অসামান্য” জনপ্রিয় নাম।
ভারতীয় উপমহাদেশ: যুদ্ধ থামিয়ে শান্তির চুক্তি — আবার যুদ্ধের ছোঁয়া
ট্রম্পের মধ্যস্থতায় ভারত এবং পাকিস্তানের সম্ভাব্য পরমাণু দ্বন্দ্ব একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে থেমে গেল। পাকিস্তান সরকার প্রশংসা করলেও ভারত নিশ্চিতভাবে জানায় — তারা কোনো মধ্যস্থকারীর অংশ ছিল না।
এর অর্থ কি শান্তির বিজয়? না, এটা একটা রাজনৈতিক চাল ছিল — ভারতের বাজারে প্রবেশের দরজা খুলে দেওয়ার এবং পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের দাবা খেলা। তাই শান্তি নয়, এটি হলো কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের খেলাঘর।
মার্কিন সীমা, করোনা ব্যবসা, ভোট প্রক্রিয়াকরণ — কার্যক্রম হৈছে শান্তির উন্নয়ন
ট্রম্প একইসাথে মার্কিন স্থলসীমাতে সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেন… “তুলনামূলক শান্তি বজায় রাখার জন্য।” তিনি বন্দিদের ক্ষমা করেন… “মানবিকতার বর্ণনায় শান্তির নিলাম।”
তিনি ভোট প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেন… “গণতন্ত্রকে স্বাস্থ্যের মতো পালন করে শান্তির নীতি।”
এগুলো পরিস্কার করে বলছে — ট্রাম্প যখন শান্তির কথা বলেন, তখন তাঁর চিন্তা বড় হয়, রণনীতি হয় নির্ভরযোগ্য, আর উদ্দেশ্য হয় শুধু ক্ষমতা ধরে রাখা।
অপশিল্প থেকে পুরস্কার: নোবেল কমিটির চালাকি
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি একটি বছরের মধ্যে নির্বাচন করে “শান্তির নায়ক” আর এইবার তাদের ভোটমাত্র ছিল মাত্র পাঁচজন। ট্রাম্পের প্রচার, প্রভাব আর আন্তর্জাতিক স্তরে “শান্তিকামী” হিসেবে পরিচিতি সত্ত্বেও তারা ২০২৫ সালে মারিয়া করিনা মাচাদো-কে পুরস্কার দেয়। ইউরোপের অনেক বিশ্লেষক এটি বোঝেন — ট্রাম্পকে স্কোর দেয়ার চেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ ও গণতান্ত্রিক মৌলিকতা গুরুত্ব দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু একটি কথা স্পষ্ট — নোবেল শান্তি পুরস্কার হল যুদ্ধবিরতির স্বীকৃতি, যুদ্ধ-বিচারণ নয়। আর ট্রাম্প সেই স্বীকৃতিটি কখনও পাননি।
উপসংহার: শান্তি এক বুক বেঁধে চলা নৌকা, আর ট্রাম্প সেই বালুচর
যখন ট্রাম্প “শান্তি”-র কথা বলেন, তিনি আসলে বোঝান—যুদ্ধকে থামানো নয়, বরং নতুন করে সাজানো; প্রয়োজনে এক রণক্ষেত্র বন্ধ করে আরেকটি খোলা।
যখন তিনি “প্রতিরক্ষা”-র কথা বলেন, তাঁর সেই প্রতিরক্ষা কেবল আমেরিকার জন্য নয়—বরং বিশ্বের একাংশকে বাঁচিয়ে রেখে অন্য অংশকে দাবার ঘুঁটির মতো ব্যবহার করা।
আর যখন তিনি “নোবেল শান্তি পুরস্কার”-এর কথা তোলেন, তখন তাঁর শান্তি মানে হয় আরেকটি জয়ের মুকুট—যুদ্ধের মতোই প্রতিযোগিতামূলক, রাজনৈতিকভাবে লাভজনক এক পুরস্কার।
সূত্রঃ Al Jazeera, The Guardian+1, New York Post, AP News








Leave a Reply