দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা
দুই দশক আগে পর্যন্ত আফগান তালেবান ও পাকিস্তানের সম্পর্ককে বর্ণনা করা হত “অটুট”, “কৌশলগত গভীরতার ভিত্তি”, এমনকি “জিহাদের অভিন্ন প্রতীক”- এই শব্দে। পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ISI তালেবানকে প্রশিক্ষণ, আশ্রয় ও অস্ত্র দিয়ে গড়ে তুলেছিল এবং আফগান ভূখণ্ডকে নিজের নিরাপত্তা কৌশলেরই এক সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে দেখত। কিন্তু ২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর এই সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে।
যে জিহাদের প্রতীক একসময় দুটি দেশকে এক করেছিল, আজ সেই একই প্রতীক দুই দেশের রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ, নিরাপত্তা সংকট এবং কৌশলগত সংঘাতের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এই নিবন্ধে আমরা পর্যায়ক্রমে দেখব—
- তালেবান কেন এখন পাকিস্তানের চাপ স্বীকার করছে না,
- TTP–র ইস্যু কীভাবে দুই দেশের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু,
- ডিউরান্ড লাইন আবার কেন ভূরাজনৈতিক বারুদ,
- তালেবান কেন ভারতের দিকে ঝুঁকছে,
- এবং কেন পাকিস্তানের “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” ধারণা এখন ব্যর্থ।
জিহাদের যৌথ প্রতীক এখন বিভেদের রেখা
১৯৮০–৯০ এর দশকে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধের সময় যে মতাদর্শ, যে জিহাদী প্রতীক, যে স্লোগানে তালেবান ও পাকিস্তান এক হয়েছিল—তা এখন উল্টোভাবে দুই দেশের জাতীয়তাবাদের সংঘর্ষের দৃশ্যপটে দাঁড়িয়ে আছে।
এক সময় পাকিস্তান তালেবানকে “বন্ধু”, “ভাই”, “কৌশলগত সম্পদ” মনে করত।
কিন্তু এখন তালেবান বলছে—
“আমিরাতকে নির্দেশ দেয়ার অধিকার কেবল কাবুলের, রাওয়ালপিন্ডির নয়।”
এই ঘোষণা পাকিস্তানের সামরিক অভ্যেসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য ভূখণ্ড হিসেবে দেখেছে।
কেন এই প্রতীক বদলে গেল?
১. তালেবান এখন স্বাধীন রাষ্ট্রীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
২. পাকিস্তানের অভ্যন্তরে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান–এর সন্ত্রাস বাড়ছে, যার দায় তারা তালেবানের ওপর চাপাতে চায়।
৩. তালেবান মনে করে—পাকিস্তান তাদের প্রতি “অধিকর্তার আচরণ” করছে।
৪. অঞ্চলজুড়ে নতুন কূটনৈতিক শক্তি-বিন্যাসে তালেবান আরও বিকল্প পাচ্ছে (চীন, ভারত, তুর্কমেনিস্তান, কাতার, ইরান)।
পাকিস্তানের ‘সামরিক’ রাষ্ট্র বনাম তালেবানের ইসলামি জাতীয়তাবাদ
পাকিস্তান রাষ্ট্র আজ এক ধরনের “মিলিটারি-ডমিনেটেড সিকিউরিটি স্টেট।”
এখানে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে মূলত সেনাবাহিনী।
বিপরীতে তালেবান ইসলামি শাসনের সঙ্গে আফগান জাতীয়তাবাদকে মিলিত করেছে। তারা ইসলামি আমিরাতকে এমনভাবে দাঁড় করাতে চায় যাতে এটি কোনও বহিরাগত নির্দেশ বা নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ না করে।
এটি পাকিস্তানের জন্য অপ্রত্যাশিত।
তারা ভেবেছিল—ক্ষমতায় ফিরে তালেবান আগের মতোই পাকিস্তানের কথামতো চলবে।
কিন্তু তালেবান এখন স্পষ্ট:
- তারা পাকিস্তানের অনুরোধে টিটিপি-কে দমন করবে না
- তারা পাকিস্তানের ডিপোর্টেশন নীতি মেনে নেবে না
- এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তারা Durand Lineকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না
এগুলো পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক স্বপ্নের জন্য বড় ধাক্কা।
TTP: দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুর বিস্ফোরক ইস্যু
তেহরীক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP)—যা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছে—এখন তালেবান-পাকিস্তান সংঘাতের সবচেয়ে বড় কারণ।
তালেবান কেন TTP-কে দমন করছে না?
১. মতাদর্শিক ঘনিষ্ঠতা: TTP–র মতাদর্শ তালেবানের সঙ্গেই মেলে।
২. ট্রাইবাল লিঙ্ক: দু’পক্ষের যোদ্ধাদের একই জাতিগোষ্ঠী, একই ভাষা।
৩. তালেবানের বিশ্বাস যে- পাকিস্তান তাদের অভ্যন্তরীণ সমাধান নিজেই করবে।
৪. তালেবান মনে করে- পাকিস্তান তাদের কাছে এমন দাবি তোলা “সংবিধিবিরুদ্ধ হস্তক্ষেপ।”
পাকিস্তান চায় তালেবান TTP–কে সীমান্ত থেকে সরিয়ে দিক।
তালেবান বলছে:
“TTP পাকিস্তানের সমস্যা, আফগানিস্তানের নয়।”
এটি এখন দুই দেশের মধ্যে এক অনিবার্য সংঘর্ষের কারণ।
ডিউরান্ড লাইন: নতুন করে টানাপোড়েন
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে ২,৬৪০ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্ত (Durand Line) -যা পাকিস্তানকে আফগানিস্তান থেকে পৃথক করে- সেটা ইতিহাসের শুরু থেকেই বিতর্কিত।
তালেবান এটিকে কখনোই আন্তর্জাতিক সীমান্ত বলে মানেনি।
২০২২–২০২৪ সালের দিকে সীমান্তে বহু সংঘর্ষে পাকিস্তান সেনা নিহত হয়, চেকপোস্ট গুঁড়িয়ে দেয় তালেবান, পাকিস্তান পাল্টা ড্রোন হামলা চালায়।
এতে দেখা গেছে—
দুই দেশের সীমান্ত এখন “লো-ইন্টেনসিটি কনফ্লিক্ট জোন (কম তীব্রতার সংঘাত অঞ্চল)।”
Durand Line এখন দক্ষিণ এশিয়ার নতুন যুদ্ধসীমা হয়ে উঠছে।
পাকিস্তানের কৌশলগত গভীরতা নীতি ব্যর্থ
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
কিন্তু তালেবান এখন ভারতসহ অন্য শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করছে।
- ভারত আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা, অবকাঠামো প্রকল্প ও ডিপ্লোম্যাসি বাড়িয়েছে
- আফগানিস্তান–চীন অর্থনৈতিক করিডর (ACEP) নিয়ে আলোচনা চলছে
- ইরান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে তালেবান বাণিজ্য বাড়াচ্ছে
- রাশিয়া তালেবানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহ দেখাচ্ছে
এতে পাকিস্তান একা পড়ে যাচ্ছে।
তাদের পূর্বের প্রক্সি-নীতি এখন উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকট: তালেবানের জন্য সুযোগ
পাকিস্তান এখন—
- ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে
- রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায়
- সেনাবাহিনীর প্রতি জনরোষে
- আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতায়
এই পরিস্থিতিতে তালেবান মনে করে—
“পাকিস্তানের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই।”
বরং তারা চেষ্টা করছে—নিজস্ব কূটনীতি, নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো, নিজস্ব বাণিজ্য পথ তৈরি করতে।
তালেবানের উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার জন্য কী বার্তা দেয়?
১) পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রক নয়
এটি দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে।
২) তালেবান এখন আঞ্চলিক খেলোয়াড়
এটি ভারতের জন্য সুযোগ এবং পাকিস্তানের জন্য হুমকি।
৩) সীমান্ত সন্ত্রাস ও সংঘাত বাড়তে পারে
তেহরিক-ই-তালেবানের হামলা পাকিস্তানে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৪) চীন নতুন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আসতে পারে
কারণ তাদের “চায়না পাকিস্তান ইকোনোমিক করিডোর (CPEC)” ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্বার্থ রয়েছে।
উপসংহার
জিহাদের প্রতীক বদলে গেছে জাতীয়তাবাদের প্রতীকে
একসময় তালেবান ও পাকিস্তান “এক জিহাদের দুই সঙ্গী” হিসেবে বিবেচিত হতো।
আজ সেই সম্পর্ক ভেঙে গেছে।
তালেবান এখন পাকিস্তানকে বলছে—
“আমরা কারো প্রক্সি নই।”
পাকিস্তান এখন বুঝছে—
তারা যে শক্তিকে দুই দশক ধরে লালন করেছে, সেই শক্তিই এখন তাদের নিরাপত্তা হুমকি।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি তাই নতুন অক্ষরেখায় দাঁড়িয়েছে—
যেখানে তালেবান নিজের পরিচয় নিয়ে বেশি দৃঢ়, আর পাকিস্তান আগের চেয়ে বেশি দুর্বল। পাকিস্তান এখন ঝুঁকছে অন্য শিকারের দিকে। স্পষ্ট করে বললে বাংলাদেশের দিকে।
সূত্রঃ The New York Times date 17 November 2025








Leave a Reply