বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অদ্ভুত ধারাবাহিকতা দেখা যায়—
যে শাসক যত শক্তিশালী বা জনপ্রিয় হোক, সময়মতো তাকে ফেলে দেওয়ার জন্য তত বেশি অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ঘটে।
এ যেন আমাদের ইতিহাসের এক স্থায়ী রূপ।
চাপ, ষড়যন্ত্র, স্বার্থের লেনদেন এবং অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতার কারণে জনপ্রিয় বা শক্তিশালী শাসকের পতন।
এটি শুধু আধুনিক সময়ের ঘটনা নয়; প্রাচীন যুগ থেকে ঘুরেফিরে একই দৃশ্য দেখা যায়।
সম্রাট অশোক (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতক)
সম্রাট আশোক যদিও শুধু বাংলার শাসক ছিলেন না। তবে বাংলার একটি বিরাট অঞ্চল তার শাসনাধীনে ছিলো, তাই এই নিবন্ধে যোগ করেছি।
অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও রাজপুত্রদের বিদ্রোহ
অশোকের শাসনের শেষ দিকে মৌর্য সাম্রাজ্যের শক্তি কমতে শুরু করে।
কারণগুলো ছিল—
- প্রাদেশিক শাসকদের অবাধ স্বাধীনতা
- রাজপরিবারের অন্তর্কলহ
- গোপন বিদ্রোহ
- স্থানীয় অভিজাতদের বিশ্বাসঘাতকতা
অশোক জনপ্রিয় হলেও, সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরেই তার উত্তরাধিকারীকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত মৌর্য সাম্রাজ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে প্রায় বিলুপ্ত হয়।
অর্থাৎ—বাহিরের শত্রুর চেয়ে ভেতরের বিশ্বাসঘাতকরাই ছিল বড় কারণ।
পাল সাম্রাজ্য (৮ম–১২শ শতক): অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা ও আঞ্চলিক নেতাদের উত্থান
পাল সাম্রাজ্য ছিল বাঙালির প্রথম বড় সাম্রাজ্য।
ধর্মপাল, দেবপাল ছিলেন শক্তিশালী ও জনপ্রিয় শাসক।
কিন্তু পতনের কারণ ছিল—
- সামন্তরাজাদের বিদ্রোহ
- কর না দেওয়া
- ক্ষমতার লোভে অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ
- বিদেশি আক্রমণকারীদের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বংশের আঁতাত
ফলে একসময়ের মহাশক্তিশালী সাম্রাজ্য ভেঙে যায়—
কারণ এটি—বাঙালি সামন্তদের পরস্পরকে টেনে নামানোর প্রবণতা।
সেন বংশ (১১শ–১২শ শতক): নিজের লোকেরই পিঠে ছুরি
বল্লাল সেন ও লক্ষ্মণ সেন জনপ্রিয় শাসক ছিলেন।
তবুও সেন বংশের পতন ঘটে:
- নিজস্ব সেনানিবাসের বিশ্বাসঘাতকতা
- স্থানীয় জমিদারদের সুযোগসন্ধানী ভূমিকা
- আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যের অভাব
ইতিহাসে লেখা আছে—লক্ষ্মণ সেন পালানোর আগে বহু সেনাধ্যক্ষই তাকে সাহায্য করেননি।
বাংলার সুলতানি যুগ (১৩শ–১৬শ শতক): ধারাবাহিক বেইমানি
এই সময় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়—
একজন শাসক জনপ্রিয় হলেও তার মন্ত্রী, সেনাপতি ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাই তাকে হত্যা বা ক্ষমতাচ্যুত করে।
কয়েকটি উদাহরণ:
- গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ—অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রে দুর্বল
- শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ—সামন্তদের বিদ্রোহ
- নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ—নিজ স্বজনের বিশ্বাসঘাতকতা
এ যেন বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে থাকা “কেউ টিকে থাকতে দেবে না” মানসিকতা।
মুঘল-বাংলা ও নবাবি যুগ (১৭শ–১৮শ শতক): বিশ্বাসঘাতকতার সবচেয়ে কুখ্যাত অধ্যায়
বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে নির্মম বিশ্বাসঘাতকতার নাম—
মীর জাফর ও পলাশীর যুদ্ধ
- নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন তরুণ, জনপ্রিয় এবং সংস্কারকামী।
- কিন্তু অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী—উমেদার, বেনিয়া, সেনাপতি, জমিদার—
ইংরেজের সঙ্গে চুক্তি করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। - যুদ্ধের মাঠে সৈন্যরা ইচ্ছাকৃতভাবে লড়েনি।
- নবাবকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় নিজের আত্মীয়দের সহায়তায়।
এটি প্রমাণ করে—
বাংলার শাসককে ফেলে দেওয়া হয় বহিরাগত নয়, বরং অভ্যন্তরীণ প্রতারণার কারণেই।
ব্রিটিশ-বাংলা ও পাকিস্তান যুগ: একই চিত্র
বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১)
বাংলা শক্তিশালী হবে দেখে নিজেরাই রদ চাইল।
১৯৪৭–১৯৭১: আবারও বেইমানির ইতিহাস
১৯৭১ সালে:
- পাকিস্তানের সঙ্গে আঁতাত
- রাজাকার-আলবদর-আলশামস তৈরি
- মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়ানো
নিজেদের ভিতরের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল সবচেয়ে বড় বাধা।
স্বাধীন বাংলাদেশ: জনপ্রিয় নেতৃত্ব থেকে শেখ হাসিনা পর্যন্ত
এগুলো আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাস। এখানে সরাসরি অভিযোগ বা দোষারোপ না করে সতর্কতার সাথে শুধু ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করছি।
১৯৭৫: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে নির্মম বিশ্বাসঘাতকতা—
দেশের প্রতিষ্ঠাতাকে সপরিবারে হত্যার সাথে জড়িতঃ
- সেনাবাহিনীর ভেতরের একটি অংশ
- রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশ
- আন্তর্জাতিক যোগাযোগে প্রভাবিত গোষ্ঠী
নিজ দলের ভেতর থেকেও অসন্তোষ ও ষড়যন্ত্র ছিল।
১৯৯১–২০০৬ পর্যন্ত: জনপ্রিয় সরকারগুলোকে ঘিরে ষড়যন্ত্র ও অস্থিরতা
বাংলাদেশের কোনো জনপ্রিয় সরকারই “ষড়যন্ত্র মুক্ত” ছিল না:
- বিএনপি আমলে অন্তর্দ্বন্দ্ব
- আওয়ামী লীগ আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট হামলার মতো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র
- জঙ্গিবাদের উত্থান
- প্রশাসনের অভ্যন্তরে ভাঙন
সবকিছুর শিকড়—
নিজস্ব রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক বিশ্বাসঘাতকতা।
শেখ হাসিনা (১৯৯৬–২০০১, ২০০৯–২০২৪): জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ও শেষমেশ ক্ষমতাচ্যুতি
শেখ হাসিনা ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জনপ্রিয় নেতা।
কিন্তু তার পতনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—
(১) দলের ভেতরের অস্বস্তি, স্বার্থবিরোধী গোষ্ঠী
নৌকা শক্তিশালী হলেও—
- স্থানীয় পর্যায়ের দুঃশাসন
- সিন্ডিকেট ও অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং
- দলীয় লোভী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনরোষ
এসব ভেতরের প্রতিরোধই সরকারের ভাবমূর্তি কমায়।
(২) রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অংশের অসন্তোষ
অনেক সময়ই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়, যার ফল রাজনীতিতে পড়ে।
(৩) আন্তর্জাতিক চাপ ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
ভারত–চীন–আমেরিকা—সব পক্ষের মধ্যকার কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব বাংলাদেশে চাপ সৃষ্টি করে।
বহিরাগত চাপের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সুযোগসন্ধানীরা হাত মিলায়—
এটাই ইতিহাসের পুরনো কাহিনি।
(৪) জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সুযোগ নেওয়া
এই মডেলটি বাংলায় বারবার দেখা যায়—
অভ্যন্তরীণ গ্রুপ + বিদেশি চাপ + জনঅসন্তোষ → জনপ্রিয় সরকারের পতন।
(৫) শেষমেষ এক ধরনের “রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা” তৈরি
যে অবস্থায় জনপ্রিয় শাসকও দল, প্রশাসন ও জনগণের একটি অংশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
বাংলার ইতিহাসে এটি নতুন কিছু নয়—
অশোক থেকে পাল, সেন, নবাব, বঙ্গবন্ধু—সব জায়গায় একই ছক।
বাংলার রাজনৈতিক চরিত্রের অভিন্ন বৈশিষ্ট্য
বাংলার ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়:
১. বাহ্যিক শত্রুর চেয়ে অভ্যন্তরীণ প্রতারণাই বেশি ক্ষতিকর
২. ক্ষমতা টিকলে ঈর্ষা, না-টিকলে বিশ্বাসঘাতকতা দেখা যায়
৩. শাসকের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হলে অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী সেই সুযোগ নেয়
৪. বিদেশি শক্তি সবসময় অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে ব্যবহার করে
৫. জনপ্রিয় নেতার পতন সাধারণত বাইরের কারণে নয়—ভেতরের কারণে
এটাই বাংলার রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি।
পরিশেষে: বাঙালির ইতিহাস—উৎথানের চেয়ে পতনের গল্প বেশি
প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক বাংলাদেশ পর্যন্ত বারবার দেখা যায়—
জনপ্রিয় নেতা থাকলে তার পাশে কম লোক পাওয়া যায়, কিন্তু তাকে সরানোর সময় বহু লোক এগিয়ে আসে।
এটি বাঙালির সমাজ-মনস্তত্ত্বে গভীরভাবে প্রোথিত—
ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ, বিভাজন, ঈর্ষা, এবং “আমি না পারলে অন্যও পারবে না”—এই মানসিকতা। ফলে বাংলা বারবার সম্ভাবনা গড়েও নিজ হাতে তা ভেঙে ফেলে।
অশোক থেকে পাল, সেন, নবাব সিরাজ, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা পর্যন্ত একটাই সত্য—
বাঙালির পতন কখনো সরাসরি বাইরের শত্রুর কারণে হয়নি।
পতন হয়েছে নিজের অভ্যন্তরীণ প্রতারণা, বিভাজন ও ঈর্ষার কারণে।
এ ইতিহাস আমাদের সামনে একটাই শিক্ষা রেখে যায়—
ঐক্য ছাড়া বাঙালির উন্নতি অসম্ভব। বিভাজন থাকলে বেইমানি নিশ্চিত, আর বেইমানি থাকলে পতন নিশ্চিত।








Leave a Reply