সূত্র: The Week (World Exclusive, 5 November 2025)
লেখক: শেখ হাসিনা
বাংলা রূপান্তর ও বিশ্লেষণ: আতাউর রহমান খান
ভূমিকা
ভারতের খ্যাতনামা সাপ্তাহিক পত্রিকা The Week-এর এক বিশ্ব এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে শেখ হাসিনার লেখা একটি বিশদ প্রবন্ধ—“Bangladesh now ruled by unaccountable elite paying lip service to democracy.”
এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এক নিখুঁত কিন্তু বেদনাময় ভাষায় চিত্রিত করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সার হলো—বাংলাদেশ আজ এমন এক গোষ্ঠীর হাতে, যারা গণতন্ত্রের মুখোশ পরে আছে, কিন্তু জবাবদিহির কোনো বাস্তব চর্চা নেই।
ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন ও গণতান্ত্রিক মুখোশ
হাসিনার মতে, আজকের বাংলাদেশে ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে গেছে।
রাষ্ট্রযন্ত্র—প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান—সবই ক্রমে এমন এক গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে, যারা নিজেদের দায়মুক্ত রেখে শাসন করছে। তারা গণতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু গণতান্ত্রিক চর্চা করে না।
তিনি লেখেন—
“Bangladesh is now ruled by an unaccountable elite paying lip service to democracy while the country cries out for free and fair elections.”
অর্থাৎ, ভোট ও নির্বাচনের আড়ালে চলছে এক নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা কাঠামো।
নাগরিকের অধিকার ও রাজনৈতিক বিরোধীদের অস্তিত্ব আজ তুচ্ছ হয়ে পড়েছে। সরকার ও তার সহযোগী প্রশাসন গণতন্ত্রের ভাষা ব্যবহার করলেও বাস্তবে সেটি হয়ে উঠেছে ‘selective democracy’—যেখানে অংশগ্রহণ নির্ধারিত হয় ক্ষমতাবানদের অনুমতিতে।
জনগণের অংশগ্রহণহীন রাজনীতি
প্রবন্ধে শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন—
গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়; বরং সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই অংশগ্রহণ ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চেয়ে ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্বে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
তিনি লেখেন—
“Democracy does not end with the ballot box; it begins there. The people must have a voice beyond election day.”
এই বক্তব্যে স্পষ্ট—তিনি গণতন্ত্রকে দেখছেন এক অবিরাম প্রক্রিয়া হিসেবে, যা কেবল নির্বাচন নয়, প্রশাসন, আইন প্রণয়ন, বিচার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্য দিয়েও বিকশিত হয়।
ক্ষমতা বনাম দায়বদ্ধতা
শেখ হাসিনার মতে, দেশের রাজনীতি এক নতুন রূপ নিয়েছে—ক্ষমতার ব্যক্তিকরণ।
রাষ্ট্র পরিচালনায় যাদের কোনো আনুষ্ঠানিক দায় নেই, তারাই পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে প্রশাসন, অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া।
তিনি ইঙ্গিত করেছেন এমন এক “অদৃশ্য ক্ষমতাকেন্দ্র”-এর দিকে, যা নীতি নির্ধারণ করে, কিন্তু জনগণের কাছে জবাবদিহি করে না।
এই গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য হলো—তারা গণতন্ত্রের মূল্যবোধ নিয়ে কথা বলে, কিন্তু সেই গণতন্ত্রের ভিতর জনগণকে চুপ করিয়ে রাখে।
প্রবন্ধে বলা হয়—
“When a few men control every decision, the system may still look like a democracy, but it ceases to be one in spirit.”
অর্থাৎ, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় গণতন্ত্রের বাহ্যিক রূপ থাকলেও এর আত্মা বিলুপ্তপ্রায়।
বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নে
শেখ হাসিনা প্রবন্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিচার ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের সীমিত স্বাধীনতা নিয়ে।
তিনি মনে করেন—যখন বিচার বিভাগ বা সংবাদমাধ্যম তাদের সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করতে পারে না, তখন রাষ্ট্রের ভিতরে একটি ভয় ও আত্মগোপনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
এই অবস্থায় নাগরিকরা ধীরে ধীরে মত প্রকাশের অধিকার হারায় এবং ক্ষমতাবানদের সমালোচনা করা বিপজ্জনক হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন,
“A democracy without accountability in courts or media is like a body without a heartbeat.”
এই মন্তব্যে বোঝা যায়—তিনি গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হিসেবে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতাকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন।
ভবিষ্যতের পথ: সংস্কারের আহ্বান
প্রবন্ধের শেষভাগে শেখ হাসিনা কিছু নির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব করেছেন, যেগুলো না আনলে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের মর্ম হারাবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
তার প্রস্তাবগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ—
- রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন — দলীয় রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা — যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার আইনের মাধ্যমে রোধ করা যায়।
- নির্বাচন কমিশনের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা — জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।
- সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা জোরদার করা — যেন জনমত ও প্রতিরোধের ভারসাম্য থাকে।
তিনি বলেন,
“True democracy thrives where citizens are informed, free, and fearless.”
উপসংহার
শেখ হাসিনার প্রবন্ধটি কেবল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, বরং এক ধরনের নৈতিক সতর্কবার্তা—যে রাষ্ট্রে জনগণ কণ্ঠহীন, সেখানে গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না।
তিনি ইঙ্গিত করেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কত দ্রুত রাষ্ট্র তার জবাবদিহির সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে তার ওপর।
নইলে “গণতন্ত্র” নাম থাকবে, কিন্তু তার ভিত থাকবে না।
আজকের বাস্তবতায় তাঁর এই বক্তব্য অনেকের কাছে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া মনে হতে পারে, কিন্তু বৃহত্তর দৃষ্টিতে এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবেকের প্রতি এক গুরুতর প্রশ্নচিহ্ন:
আমরা কি সত্যিই গণতন্ত্র চাই, নাকি শুধু তার ছায়া দেখতে ভালোবাসি?
বাংলাদেশ এখন জবাবদিহিহীন এলিট শ্রেণির হাতে: শেখ হাসিনার The Week প্রবন্ধে নতুন সতর্কবার্তা








Leave a Reply