নীরবতার ভেতর ঈশ্বরের উপস্থিতি
বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলোর পাশাপাশি কিছু ক্ষুদ্র অথচ গভীর চিন্তাশীল ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক আন্দোলন রয়েছে, যেগুলো প্রচলিত ধর্মীয় কাঠামোকে অস্বীকার করে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছে। কোয়াকারিজম তেমনই একটি আন্দোলন—যা ধর্ম, নৈতিকতা ও মানবিকতার এক অনন্য সমন্বয়।
উৎপত্তি ও প্রবর্তক
কোয়াকারিজমের জন্ম ১৭শ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অস্থিরতার এক উত্তাল সময়ে এটির উৎপত্তি। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জর্জ ফক্স (George Fox), যিনি ১৬৪০-এর দশকে প্রচলিত চার্চ ব্যবস্থা ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কোনো পুরোহিত, ধর্মীয় আচার বা গির্জা প্রয়োজন নেই—প্রত্যেক মানুষের অন্তরে এক “Inner Light” বা “অন্তর্গত আলোক” আছে, যা সরাসরি ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর।
মৌলিক বিশ্বাস
কোয়াকারিজমকে অনেকেই খ্রিষ্টধর্মের একটি শাখা বলে মনে করেন, তবে সময়ের সঙ্গে এটি এমন এক স্বাধীন দর্শনে পরিণত হয় যা “অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা” ও নীরব ধ্যানকে ধর্মীয় মূল হিসেবে গ্রহণ করে। এর মূল বিশ্বাসগুলো হলো—
- Inner Light: প্রত্যেক মানুষের অন্তরে ঈশ্বরের উপস্থিতি।
- Equality: জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থান—সবক্ষেত্রে সমান মর্যাদা।
- Simplicity: জীবনের সব ক্ষেত্রে সরলতা ও অতিরিক্ততা বর্জন।
- Peace Testimony: যুদ্ধ, সহিংসতা ও প্রতিশোধের সম্পূর্ণ বিরোধিতা।
- Integrity: সত্যনিষ্ঠা ও নৈতিকতার প্রতি অটল আনুগত্য।
উপাসনা ও আচার
কোয়াকার উপাসনা প্রচলিত গির্জার মতো নয়। কোনো পুরোহিত, গান বা নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ পাঠ নেই। বরং তারা নীরব কক্ষে বসে ধ্যান করেন, যতক্ষণ না কেউ “Inner Light”-এর প্রেরণায় কথা বলে ওঠেন। এই নীরব উপাসনাকেই তারা বলে “Meeting for Worship”।
এখানে ঈশ্বরকে অনুভব করা হয় অভ্যন্তরীণভাবে, বাহ্যিক কোনো প্রতীকে নয়। ফলে কোয়াকারিজমে ধর্মীয় কর্তৃত্ব বা গির্জার কাঠামো একেবারেই অনুপস্থিত।
সামাজিক প্রভাব
কোয়াকাররা বিশ্বের নানা স্থানে সামাজিক ন্যায়বিচার, দাসপ্রথা বিলুপ্তি, নারীশিক্ষা, শান্তিবাদ ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব রেখেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলন, ব্রিটেনে শান্তি আন্দোলন এবং মানবিক ত্রাণকার্যে তাদের অবদান সুপরিচিত।
১৯৪৭ সালে Friends Service Council (ইংল্যান্ড) ও American Friends Service Committee (যুক্তরাষ্ট্র) যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করে—মানবতার সেবায় তাদের নিরব কিন্তু কার্যকর ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে।
কোয়াকারিজম কি স্বাধীন ধর্ম?
যদিও কোয়াকারিজম খ্রিষ্টধর্ম থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে, তবু বর্তমান বিশ্বে এটি একটি স্বতন্ত্র ধর্ম বা আধ্যাত্মিক দর্শন হিসেবে বিবেচিত। অনেক কোয়াকার এমনকি নিজেদের খ্রিষ্টান হিসেবে পরিচয়ও দেন না—তারা ঈশ্বরকে সর্বজনীন চেতনা হিসেবে দেখেন, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ বা প্রফেটের অনুসারী হিসেবে নয়।
তাই কোয়াকারিজমকে আজ একটি মানবিক ও নৈতিক আধ্যাত্মিক আন্দোলন, আবার অনেকের মতে একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় পথ বলা চলে।
উপসংহার
কোয়াকারিজম শেখায়—ঈশ্বর দূরের কেউ নন; তিনি প্রতিটি সত্তার অন্তরে, নীরবতার গভীরে। এই ধর্ম মানুষকে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা থেকে মুক্ত করে অন্তর্মুখী শান্তি, সত্যবাদিতা ও মানবপ্রেমের পথে আহ্বান জানায়।
যে পৃথিবীতে ধর্ম অনেক সময় বিভাজনের কারণ হয়, সেখানে কোয়াকারিজম দেখিয়েছে—নীরবতাও হতে পারে ঈশ্বরের ভাষা এবং বিশ্বাস মানে কেবল উচ্চারণ নয়, বরং হৃদয়ের স্বচ্ছতা।








Leave a Reply