পাকিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতমালা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত নয়, এর গহিনে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত ও প্রাচীন জনগোষ্ঠী—কালাশ। সংখ্যায় অতি ক্ষুদ্র এই সম্প্রদায়কে ঘিরে আছে অসংখ্য রহস্য, কিংবদন্তি ও ইতিহাস।
উৎপত্তি ও বংশপরম্পরা
কালাশ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো, তারা নাকি আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের সেনাদের বংশধর। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে আলেকজান্ডারের সেনারা ভারত অভিযানে এসেছিল। ধারণা করা হয় কিছু সৈন্য হিন্দুকুশের উপত্যকায় বসতি স্থাপন করে যায়। কালাশদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য—তাদের উজ্জ্বল চোখ, ফর্সা গায়ের রঙ, ইউরোপীয়দের মতো চেহারার গঠন—এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিকরা এ বিষয়ে একমত নন। অনেকের মতে, কালাশরা স্থানীয় দ্রাবিড় বা প্রাচীন ইন্দো-আর্য উপজাতির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে টিকে থাকা এক অনন্য জনগোষ্ঠী।
ভিন্ন ধর্মবিশ্বাস
পাকিস্তানের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে কালাশদের ধর্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন। কালাশরা নিজেদের ধর্মকে বলে “কালাশা”, যা প্রাচীন বহুদেববাদী বিশ্বাসের ধারক। তারা মালেক, ইমরা ও জেষ্টাক নামের দেবতা সহ বহু দেব-দেবী ও প্রকৃতির পূজা করে। তাদের বিশ্বাসে রয়েছে সূর্য, চাঁদ, পাহাড়, নদী, পশুপাখি—সবই দেবত্বের অংশ। দেবদেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ, নৃত্য ও সঙ্গীত তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে তারা ওয়াইন ও বিশেষ খাবারের ব্যবহার করে, যা পার্শ্ববর্তী মুসলিম সমাজের কাছে বিস্ময়ের বিষয়।
তাদের ধর্মে শুদ্ধতা (purity) এবং অশুদ্ধতা (impurity) ধারণাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষত নারীর জীবনের নির্দিষ্ট সময় বা মৃত্যুর পর শুদ্ধিকরণের নিয়ম কঠোরভাবে মানা হয়।
উৎসবের রঙিন আমেজ
কালাশদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তাদের উৎসব। সারা বছর জুড়েই তারা উৎসব পালন করে থাকে।
- চিলাম জোশি (বসন্ত উৎসব): এই উৎসবে কালাশরা নতুন বছরের সূচনা করে। রঙিন পোশাক পরে, নাচ-গান ও পারস্পরিক ভালোবাসার প্রকাশের মধ্য দিয়ে এটি উদযাপিত হয়।
- উচাও (গ্রীষ্মকালীন উৎসব): এটি মূলত ফসল কাটার পর দেবতাদের কৃতজ্ঞতা জানানোর অনুষ্ঠান।
- চাওমোস (শীতকালীন উৎসব): বছরের সবচেয়ে বড় উৎসব, যেখানে তারা পৌরাণিক কাহিনি, গান, নাচ এবং নাট্যমঞ্চন করে থাকে।
সমাজ ও সংস্কৃতি
- কালাশ সমাজে নারীরা তুলনামূলকভাবে স্বাধীন। তারা উৎসবে পুরুষদের সঙ্গে নাচে, সিদ্ধান্তে অংশ নেয় এবং জীবনের সঙ্গী বেছে নিতে পারে।
বিয়ের আগে প্রেম ও সম্পর্কের বিষয়টি এখানে ট্যাবু নয়—যা আশপাশের মুসলিম পশতুন সমাজের সঙ্গে বৈপরীত্য তৈরি করে। - কালাশ নারীদের বিশেষ পোশাক তাদেরকে আলাদা করে চেনায়। তারা কালো রঙের লম্বা পোশাক পরে, যা রঙিন সূচিকর্মে সজ্জিত। মাথায় পরে বিশেষ পাগড়ির মতো হেডড্রেস, যেটি মুক্তো, শাঁস ও রঙিন সুতোয় সাজানো। পুরুষেরা তুলনামূলক সাধারণ পোশাক পরলেও উৎসবে সবাই অংশ নেয় নৃত্য ও গানে।
বর্তমান পরিস্থিতি
আজকের দিনে কালাশ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৫ হাজারের বেশি নয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্তির পথে। পাকিস্তান সরকার ও কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের সংস্কৃতি রক্ষায় উদ্যোগ নিয়েছে, তবে আধুনিকতার প্রভাব, সামাজিক চাপ ও ধর্মান্তরের কারণে কালাশরা ঐতিহ্য সংকটে পড়েছে।
উপসংহার
কালাশ জনগোষ্ঠী নিছক একটি উপজাতি নয়; তারা হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবসভ্যতার বৈচিত্র্যের প্রতীক। হিন্দুকুশ পর্বতের পাদদেশে আজও তারা নাচে, গান গায়, রঙিন জীবনের উল্লাসে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই প্রাচীন ঐতিহ্য আর কতদিন টিকে থাকবে আধুনিকতার ঝড়ে?








Leave a Reply