চীনের হাজার বছরের সাম্রাজ্যের ইতিহাসে একজনই নারী আছেন, যিনি নিজেকে সরাসরি সম্রাট ঘোষণা করেছিলেন। তার নাম উ জেতিয়ান (Wu Zetian)। পুরুষতান্ত্রিক কনফুসীয় সমাজব্যবস্থায় একজন নারীর পক্ষে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় পৌঁছানো ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সেই অসম্ভবকেই বাস্তবে পরিণত করেছিলেন উ জেতিয়ান।
দাসী থেকে রাজদরবারে প্রবেশ
৬২৪ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেওয়া উ জেতিয়ান একজন সাধারণ উপপত্নী হিসেবে তাং রাজবংশের সম্রাট তাইজং-এর দরবারে প্রবেশ করেন। তার কোনো রাজকীয় বংশপরিচয় বা শক্তিশালী রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছিল না। ফলে রাজদরবারে তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত দুর্বল।
সম্রাট তাইজংয়ের মৃত্যুর পর তৎকালীন রীতি অনুযায়ী উ জেতিয়ানকে একটি বৌদ্ধ বিহারে পাঠানো হয়। যেখানে তাকে আজীবন সন্ন্যাসিনী হয়ে থাকার কথা ছিল। এখানেই তার রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি হওয়ার কথা।
রাজনীতির নিয়ম ভেঙে প্রত্যাবর্তন
তবে ইতিহাস ভিন্ন পথে এগোয়। নতুন সম্রাট গাওজং—যিনি আগেই উ জেতিয়ানের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন—তাকে আবার রাজদরবারে ফিরিয়ে আনেন। এটি ছিল তৎকালীন সামাজিক ও ধর্মীয় বিধির সরাসরি লঙ্ঘন।
অল্প সময়ের মধ্যেই উ জেতিয়ান রাজদরবারে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। প্রতিদ্বন্দ্বী রাণী ও উপপত্নীদের সরিয়ে দিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন প্রধান সম্রাজ্ঞী হিসেবে।
নেপথ্য ক্ষমতা থেকে প্রকাশ্য সম্রাট
সম্রাট গাওজং দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব দায়িত্ব চলে আসে উ জেতিয়ানের হাতে। প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা—সবখানেই তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি নিজের পুত্রদের সম্রাট ঘোষণা করলেও প্রকৃত ক্ষমতা নিজের হাতেই রাখেন। শেষ পর্যন্ত ৬৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন—নিজেকে ঘোষণা করেন চীনের সম্রাট।
এই ঘটনা চীনের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
শাসনামল: দক্ষতা ও কঠোরতার যুগল চিত্র
উ জেতিয়ানের শাসন ছিল একই সঙ্গে কার্যকর ও বিতর্কিত।
তার শাসনামলে—
- মেধাভিত্তিক আমলানিয়োগ জোরদার হয়
- কৃষি ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে
- প্রশাসনিক সংস্কার চালু হয়
একই সঙ্গে—
- কঠোর গুপ্তচর ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়
- রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মমভাবে দমন করা হয়
- এমনকি নিজের পরিবারও রেহাই পায়নি
এই কারণেই ইতিহাসে উ জেতিয়ানকে কেউ দেখেন দক্ষ শাসক হিসেবে, কেউ দেখেন নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক হিসেবে।
পতন ও ইতিহাসের রায়
বৃদ্ধ বয়সে দরবারি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে উ জেতিয়ান ক্ষমতাচ্যুত হন। ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যু হয়। তার সমাধিফলকে কোনো প্রশংসা বা নিন্দা লেখা হয়নি—ফাঁকা রাখা হয়।
ইতিহাস যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই তার বিচার পাঠকের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।
উপসংহার
উ জেতিয়ানের উত্থান কেবল একজন নারীর ক্ষমতায় ওঠার গল্প নয়। এটি ক্ষমতার রাজনীতি, সামাজিক বিধিনিষেধ ভাঙা এবং ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতার এক অনন্য উদাহরণ। তিনি বিতর্কিত, কঠোর, কিন্তু একই সঙ্গে চীনের ইতিহাসে অনস্বীকার্য এক নাম।








Leave a Reply