মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে শেখ হাসিনার কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের পেছনে একটি গভীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে বলে মনে করেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও জনবুদ্ধিজীবী অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান। তাঁর মতে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সময়কালে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো রাষ্ট্রীয় পরিসর থেকে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা প্রায় সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। সেই ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রবণতার প্রতিক্রিয়াতেই শেখ হাসিনার অবস্থান সময়ের সঙ্গে আরও কঠোর হয়ে ওঠে।
দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. রেহমান সোবহান। সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম ছিল— ‘গণতান্ত্রিক ব্যর্থতার সুযোগ নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি’। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় ১৬ ডিসেম্বর, বিজয় দিবসে।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে অনিশ্চয়তা
ড. রেহমান সোবহান বলেন, দেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির দুটি স্তম্ভের একটি হিসেবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী হবে—এই প্রশ্নটি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করতে কেউই আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অথচ আওয়ামী লীগ ৭৭ বছরের ইতিহাস ধারণ করা একটি রাজনৈতিক শক্তি এবং তাদের একটি উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের গোত্রভিত্তিক রাজনীতির বাস্তবতায় আওয়ামী শক্তি হঠাৎ করে বিলীন হয়ে যাবে—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই।”
তিনি মনে করেন, এই রাজনৈতিক বাস্তবতার সুরাহা নির্বাচিত সরকারকেই করতে হবে। তা করতে ব্যর্থ হলে তথাকথিত ‘সংস্কারকৃত’ রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।
চব্বিশের আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্থান
ড. রেহমান সোবহানের মতে ২০২৪ সালের আন্দোলনের ভেতরে এমন কিছু গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল, যারা দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে উঠেছিল। ৫ই আগস্টের পর তারা সেই দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে। আবার আন্দোলনের একটি অংশের মধ্যে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রতি বিরূপ মনোভাব ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতিও বিরূপতায় রূপ নেয়।
তিনি বলেন, এই দুই প্রবণতাই ছাত্র আন্দোলনের মূল রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বিপরীত ফল বয়ে এনেছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, যারা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয়, তারা ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানে সুযোগ নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং অভ্যুত্থানের গতিমুখ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কোটা আন্দোলন ও গণ–অভ্যুত্থানের সূচনা
ড. রেহমান সোবহান জানান, ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা পুনঃপ্রবর্তন সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় থেকে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে যাওয়ার পরও মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকারদের জন্য কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখা তাঁর মতে একটি ‘উদ্ভট ধরনের ভুল’ ছিল।
তিনি উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনা প্রথমে কোটা বাতিল করেছিলেন এবং পরে হাইকোর্ট কোটা পুনঃপ্রবর্তনের রায় দিলে তাঁর সরকার সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যায়।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের নতুন রাজনৈতিক কৌশল
ড. রেহমান সোবহান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি আরও দৃশ্যমান ও সংগঠিত রূপে সামনে এসেছে। তারা নির্বাচনী সম্ভাবনাসহ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। একই সঙ্গে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের সহযোগিতার ইতিহাসকে নতুন ভাষ্যে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে।
তাঁর মতে, রাজনৈতিকভাবে কৌশলী নেতৃত্বের মাধ্যমে তারা আপাতত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের অবস্থান সতর্কতার সঙ্গে প্রকাশ করবে, যা মূলত ১৯৭১ সালের ভূমিকা ‘সাফসুতরো’ করার একটি কৌশল।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও আওয়ামী লীগের ভূমিকা
ড. রেহমান সোবহান বলেন, ১৯৯৬ সালের পর, বিশেষ করে ২০০৮ সালের পর, শেখ হাসিনা তাঁর পিতার ভাবমূর্তিকে মাত্রাতিরিক্তভাবে মহিমান্বিত করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের ভূমিকাকে অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এটি রাজনৈতিক ও নৈতিক—উভয় দিক থেকেই ভুল ছিল।
তিনি বলেন, বাস্তব সত্য হলো—১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাপ্ত গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে এবং বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ মুক্তিসংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। তবে একই সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দল, নেতা, সশস্ত্র বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালেই এসব ভূমিকার পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন ছিল, যা পরবর্তী সময়েও আরও স্পষ্টভাবে করা যেত।
তার মতে, মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগকে একমাত্র প্রধান শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা শুধু আওয়ামী লীগের জন্যই নয়, সামগ্রিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও মর্যাদার জন্যও ক্ষতিকর হয়েছে।
বিভ্রান্ত প্রজন্ম ও ইতিহাসের সংকট
ড. রেহমান সোবহান সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থে ভুল তথ্যের বিস্তার এবং সেই ভুল তথ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা এতটাই বেড়েছে যে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একটি পুরো প্রজন্মের উপলব্ধি গুরুতরভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতাই আজকের এই সংকটকে গভীর করেছে।
================================
অধ্যাপক রেহমান সোবহান সম্পর্কে
রেহমান সোবহান ১২ মার্চ ১৯৩৫ কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দার্জিলিং-এর সেন্ট পলস্ স্কুলে এবং লাহোরের অ্যাচিসন কলেজ থেকে পাশ করেন। ১৯৫৬ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম.এ ডিগ্রী অর্জন করেন।
রেহমান সোবহান ১৯৫৭ সালের অক্টোবর মাসে দেশে ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। ১৯৭৭ সালে অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণের পূর্বে তিনি বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদমর্যাদায়); শিল্প, বিদ্যুত্ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগ এবং অবকাঠামো বিভাগে (১৯৭২-৭৪) যথাক্রমে চেয়ারম্যান, গবেষণা পরিচালক, মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বিআইডিএস- এ এমিরিটাস ফেলো হিসেবে কাজ করেন। এছাড়াও কুইন এলিজাবেথ হাউজে ১৯৭৬-১৯৭৯ পর্যন্ত ভিজিটিং ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বাংলাদেশ প্রেসিডেন্ট এর এ্যাডভাইজরী কাউন্সিল (ক্যবিনেট মিনিস্টার এর পদমর্যাদায়), পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (১৯৯১) সদস্য ছিলেন। তিনি সাউথ এশিয়া সেন্টার ফর পলিসি ষ্টাডিজ-এ (২০০১-২০০৫) নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। তিনি ১৯৯৪- ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এর প্রতিষ্ঠাতা এবং নির্বাহী চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া তিনি বিআইডিএসের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন।








Leave a Reply