প্রাচীন আমেরিকার অন্যতম উন্নত সভ্যতা ছিল মায়া সভ্যতা। আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে বর্তমান মেক্সিকো, গুয়াতেমালা, বেলিজ ও হন্ডুরাসজুড়ে গড়ে উঠেছিল এই সভ্যতা। উন্নত জ্যোতির্বিদ্যা, নিখুঁত ক্যালেন্ডার, বিশাল পিরামিড ও লিখিত ভাষার কারণে মায়ারা আজও গবেষকদের বিস্মিত করে। অথচ এই সমৃদ্ধ সভ্যতা হঠাৎ করেই পরিত্যক্ত হয়ে যায়—যা আজও এক রহস্য।
কোথায় গেল মায়ারা?
খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে মায়া সভ্যতার প্রধান নগরগুলো—যেমন টিকাল, কোপান ও পালেনকে—ধীরে ধীরে জনশূন্য হয়ে পড়ে। রাজপ্রাসাদ ও ধর্মীয় কেন্দ্রগুলো পরিত্যক্ত হয়, নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়, রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মায়া জনগোষ্ঠী পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি। তাদের নগরসভ্যতা ভেঙে পড়ে, কিন্তু মানুষরা গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং আজও মায়া বংশধরেরা মধ্য আমেরিকায় বসবাস করছে।
সম্ভাব্য কারণগুলো কী?
(১) দীর্ঘমেয়াদি খরা
বিজ্ঞানীদের মতে, কয়েক দশক ধরে চলা ভয়াবহ খরার কারণে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভুট্টানির্ভর অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, খাদ্যসংকট দেখা দেয়।
(২) অতিরিক্ত বন উজাড়
নগর ও মন্দির নির্মাণের জন্য ব্যাপক বন উজাড় করা হয়। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়, বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং ভূমি উর্বরতা হারায়।
(৩) অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা
বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ চলছিল। শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার লড়াই সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
(৪) জনসংখ্যা বিস্ফোরণ
স্বল্প সম্পদের ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সৃষ্টি হয়। খাদ্য ও পানির সংকট বাড়তে থাকে।
(৫) শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা
খরা ও দুর্ভিক্ষের সময় মায়া শাসকেরা জনগণের আস্থা হারায়। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে।
মায়া ক্যালেন্ডার ও বিভ্রান্তি
২০১২ সালে মায়া ক্যালেন্ডার ঘিরে ‘পৃথিবী ধ্বংস’ গুজব ছড়ালেও গবেষকেরা বলছেন—মায়া ক্যালেন্ডার কেবল একটি সময়চক্রের সমাপ্তি বোঝায়, কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
গবেষকদের মতামত
আজকের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, একটি নয়, বরং একাধিক কারণের সমন্বয়েই মায়া সভ্যতার পতন ঘটে। পরিবেশগত বিপর্যয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবসৃষ্ট সংকট মিলেই এই উন্নত নগরসভ্যতাকে ধ্বংস করে দেয়।
ইতিহাসের শিক্ষা
মায়া সভ্যতার পতন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে, শাসনব্যবস্থা দুর্বল হলে এবং সম্পদের অপব্যবহার হলে সবচেয়ে উন্নত সভ্যতাও টিকে থাকতে পারে না।
সূত্রঃ Britannica | National Geographic








Leave a Reply