“কড যুদ্ধ” (Cod Wars): যখন মাছই হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রীয় সংঘাতের কারণ
ইতিহাসে যুদ্ধ মানেই রাজ্য দখল, ধর্ম, ক্ষমতা বা প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য রক্তক্ষয়—এমনটাই আমরা জানি। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসে এমন একাধিক সংঘাত আছে, যেখানে যুদ্ধের কারণ ছিল অবিশ্বাস্য রকম সাধারণ। তারই এক বিস্ময়কর উদাহরণ হলো মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ‘কড যুদ্ধ’।
সংঘাতের পটভূমি
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট দেশ আইসল্যান্ড। প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হলেও দেশটির অর্থনীতির প্রধান ভরসা ছিল সমুদ্র ও মাছ—বিশেষ করে কড মাছ।
অন্যদিকে তৎকালীন শক্তিশালী সামুদ্রিক রাষ্ট্র যুক্তরাজ্য (ব্রিটেন) বহু বছর ধরে আইসল্যান্ডের উপকূলবর্তী এলাকায় মাছ ধরছিলো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আইসল্যান্ড নিজেদের সামুদ্রিক অধিকার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ অতিরিক্ত বিদেশি মাছ ধরার ফলে তাদের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
কী নিয়ে শুরু হলো বিরোধ
১৯৫০-এর দশক থেকে আইসল্যান্ড ধাপে ধাপে নিজেদের মাছ ধরার সীমা (Fishing Zone) বাড়াতে থাকে—
(১) প্রথমে ৪ নটিক্যাল মাইল
(২) এরপর ১২ মাইল
(৩) পরে ৫০ নটিক্যাল মাইল
(৪) সর্বশেষ ২০০ নটিক্যাল মাইল
যুক্তরাজ্য এই সীমা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের ট্রলারগুলো আগের মতোই আইসল্যান্ডের কাছাকাছি এসে মাছ ধরতে থাকে।
যুদ্ধের রূপ
এই বিরোধ থেকে শুরু হয় তিন ধাপে সংঘটিত Cod Wars (১৯৫৮–১৯৭৬)।
যুদ্ধ মানে এখানে গোলাগুলি নয়, বরং—
(১) আইসল্যান্ডের কোস্টগার্ড ব্রিটিশ ট্রলারের জাল কেটে দিতো
(২) ব্রিটিশ নৌবাহিনী ট্রলার রক্ষা করতে এগিয়ে আসতো
(৩) সমুদ্রে একে অপরের জাহাজকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে
(৪) একাধিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উত্তেজনা চরমে ওঠে
সামরিক শক্তি বনাম কৌশল
আইসল্যান্ডের কোনো শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিলো না। কিন্তু তারা চাল দেয় ভিন্নভাবে—
(১) যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোকে চাপ দেয়
(২) হুমকি দেয়, প্রয়োজনে ন্যাটো ঘাঁটি বন্ধ করে দেবে
(৩) কূটনৈতিকভাবে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক ইস্যু বানায়
ঠান্ডা যুদ্ধের সময় উত্তর আটলান্টিকে আইসল্যান্ডের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পশ্চিমা জোট আইসল্যান্ডকে পুরোপুরি বিরোধিতা করতে পারেনি।
ফলাফল
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য পিছু হটতে বাধ্য হয়।
(১) আইসল্যান্ডের ২০০ নটিক্যাল মাইল মাছ ধরার অধিকার স্বীকৃত হয়
(২) এটি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবে Exclusive Economic Zone (EEZ) ধারণার ভিত্তি গড়ে দেয়
(৩) ছোট রাষ্ট্র হয়েও আইসল্যান্ড দেখিয়ে দেয়—কৌশল ও দৃঢ়তায় বড় শক্তিকেও পরাজিত করা যায়
কেন এই যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ
এই যুদ্ধ আমাদের শেখায়—
(১) প্রাকৃতিক সম্পদ ছোট হলেও তা রক্ষার দৃঢ়তা বড় শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে
(২) আধুনিক যুগে যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে নয়, কূটনীতি ও কৌশল দিয়েও জয়ী হওয়া যায়
(৩) মাছের মতো সাধারণ বিষয়ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ভয়ংকর সংঘাতে রূপ নিতে পারে
উপসংহার
‘কড যুদ্ধ’ প্রমাণ করে—যুদ্ধের কারণ সবসময় বন্দুক বা বোমা নয়, কখনো কখনো একটি মাছও ইতিহাস বদলে দিতে পারে।
এটি কেবল মাছ ধরার লড়াই নয়; এটি ছিলো অস্তিত্ব, অধিকার ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির যুদ্ধ।








Leave a Reply