রাশিয়ার ইতিহাসে নিষ্ঠুর শাসকের কথা উঠলেই যাঁর নাম সবার আগে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন ইভান চতুর্থ। পৃথিবী যাঁকে মনে রাখে Ivan the Terrible (ভয়ানক ইভান) নামে। ১৫৪৭ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে রাশিয়ার প্রথম ‘Tsar’ হিসেবে সিংহাসনে বসা এই সম্রাটের শৌর্য যেমন বিস্ময়কর, তেমনি তাঁর উন্মাদ প্রতিহিংসাপরায়ণতা ইতিহাসে রক্তাক্ত স্মৃতি হয়ে আছে।
জন্ম শক্তি ও ভয় — দুইয়ের মিশ্রণে এক সম্রাট
রাজকীয় উত্তরাধিকার পাওয়া ইভান শৈশব থেকেই নিপীড়ন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও ষড়যন্ত্র দেখেছেন। অভিভাবক, উপদেষ্টা, অভিজাত — সবাই তাঁকে ব্যবহার করেছে স্বার্থসিদ্ধির জন্য। ফলে ক্রমশ জন্ম নেয় এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক মানসিকতা— বিশ্বাসহীনতা, রোষ এবং যেকোনো বিরোধীকে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা।
পরিণত বয়সে এসে তাঁর চরিত্রে এই দহন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। রাশিয়াকে শক্ত হাতে একত্রিত করা, সামরিক শক্তি বাড়ানো এবং ভূখণ্ড সম্প্রসারণে তিনি সফল—কিন্তু ক্ষমতার চূড়ায় উঠতেই শুরু হয় দুঃস্বপ্ন।
Oprichnina — আতঙ্কের সাম্রাজ্য
ইভান দ্য টেরিবল ক্ষমতা সুসংহত করতে গড়ে তোলেন এক বিশেষ বাহিনী Oprichniki।
তাদের কাজ—
- সন্দেহভাজনদের ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ নয়—সরাসরি শাস্তি
- অভিজাত শ্রেণির প্রভাব ভেঙে ফেলা
- রাজদরবারে ইভানের প্রতি শতভাগ আনুগত্য নিশ্চিত করা
এই বাহিনীই রাশিয়ায় চালায় নৃশংসতা, লুণ্ঠন এবং গণহত্যা। শহর পুড়েছে, পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়েছে, হাজার মানুষ মারা গেছে — ইভানের আদেশে।
ইতিহাস গবেষকদের মতে তার শাসনমেয়াদে কেবল Novgorod গণহত্যায় দশ হাজারেরও বেশি মানুষ নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়। তাদের অনেককে বরফ ভেঙে নদীতে ডুবিয়ে মারা হয়, আবার কখনও কুকুরের মতো টেনে এনে রাজদরবারের সামনে শিরচ্ছেদ করা হয়।
নিজের ছেলেকেই হত্যা — ক্রোধের সর্বশেষ রূপ
সম্রাটের ইতিহাসে সবচেয়ে শোকাবহ ঘটনা—
‘উন্মাদ রাগে নিজের ছেলেকে হত্যা’।
রাজপ্রাসাদে একসময় ইভান ও তাঁর ছেলে, ইভান ইভানোভিচ-এর মধ্যে তীব্র তর্ক বাধে। হয়তো রাজনৈতিক মতভেদ, হয়তো রাজপুত্রের সাহসী কথা—কেউ জানে না সঠিক কারণ। কিন্তু ক্রোধে ফেটে পড়া সম্রাট হাতে থাকা রাজদণ্ড দিয়ে ছেলেকে আঘাত করেন।
ক্ষত এত গভীর ছিল যে রাজপুত্র ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন, কিছুক্ষণ পরেই মৃত্যুবরণ করেন।
চিত্রশিল্পী ইলিয়া রেপিনের বিখ্যাত চিত্রকর্ম—
“Ivan the Terrible and His Son Ivan”—
এই ট্র্যাজেডির মুহূর্তটিকে অমর করে রেখেছে।
শোকাহত সম্রাটের মুখে তখন অনুতাপ, কিন্তু ততক্ষণে বয়ে গেছে রক্ত, হারিয়েছে উত্তরাধিকার।
কেন তাঁকে ‘Terrible’ বলা হয়?
ইভানের শাসন এক paradox—
একদিকে শক্ত সামরিক কৌশলে রাশিয়াকে ইউনিফাই করা, অন্যদিকে মানসিক বিকারগ্রস্ততার কারণে নির্মম অত্যাচার।
তাঁর বিশেষণ ‘Terrible’ শব্দটি শুধু নিষ্ঠুরতার অর্থে নয়—
বরং “বিস্ময়কর, ভয়ঙ্কর, awe-inspiring”—যেখানে
গৌরব ও আতঙ্ক—দুটিই যুক্ত।
ইভানের শাস্তির ধরন — ইতিহাসের অদ্ভুত পাতায়
| শাস্তি/কৌশল | ব্যাখ্যা |
| বরফের নদীতে ডুবিয়ে হত্যা | Novgorod গণহত্যায় বহুল ব্যবহৃত |
| গরম লোহার রড দিয়ে দেহ দগ্ধ | বিদ্রোহীদের জন্য |
| জীবন্ত চামড়া ছুলে ফেলা | রাজদরবারের শাস্তির সবচেয়ে ভয়ংকর পদ্ধতি |
| জনসমক্ষে অপমান ও প্রহার | ক্ষমতাকে ভয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা |
এগুলো কেবল উদাহরণ—ইভানের শাস্তির ধরন ছিল বৈচিত্র্যময় ও ভয়ংকর।
ইতিহাসের রায়
ইভান দ্য টেরিবল—
একদিকে জাতি-গঠনের স্থপতি
অন্যদিকে রাশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে আতঙ্কের রাজা।
তিনি প্রমাণ করেছেন—
একজন শাসকের প্রতিভা যখন নিয়ন্ত্রণহীন রোষ, সন্দেহ ও ক্ষমতার লোভে ঢেকে যায়, তখন রাজা নয়—একজন উন্মাদ সম্রাট জন্ম নেয়।








Leave a Reply