সুন্নি ইসলামের চার ফিকহি মাজহাব
ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস (আকিদা) এক হলেও, ইবাদত ও সামাজিক জীবনের আইনগত ব্যাখ্যায় বিভিন্ন ধারা গড়ে উঠেছে। এই ধারাগুলোকে বলা হয় ফিকহি মাজহাব। মাজহাব কোনো আলাদা ধর্ম, দল বা আকিদা নয়; বরং কুরআন ও সুন্নাহ থেকে ব্যবহারিক বিধান নির্ণয়ের পদ্ধতি।
হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে মুসলিম সমাজ বিস্তৃত হলে নতুন নতুন সামাজিক ও আইনগত প্রশ্ন দেখা দেয়। সেই বাস্তবতা থেকেই চারজন মহান আলেমের চিন্তা ও গবেষণার ধারায় গড়ে ওঠে হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাব। প্রত্যেক মাজহাবই কুরআনকে সর্বোচ্চ দলিল হিসেবে মানে এবং সহিহ সুন্নাহকে অপরিহার্য সূত্র হিসেবে গ্রহণ করে—পার্থক্য শুধু ব্যাখ্যা ও অগ্রাধিকারের পদ্ধতিতে।
এর আগে হানাফি ও মালিকি মাজহাবের কথা লিখেছি। এই পর্বে থাকছে শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাব সম্পর্কে।
শাফেয়ি (Shafi‘i) — একটি ফিকহি ধারা / মাজহাব
শাফেয়ি ইসলাম ধর্মের কোনো আলাদা ধর্ম বা আকিদাভিত্তিক মতবাদ নয়; এটি সুন্নি ইসলামের চারটি প্রধান ফিকহি মাজহাব (সম্প্রদায়)’র একটি। এই মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ইমাম মুহাম্মদ ইবন ইদরিস আশ-শাফেয়ি (রহ.) (৭৬৭–৮২০ খ্রি.)।
শাফেয়ি মাজহাব মূলত ইসলামী আইন ও ইবাদতের বিধান নির্ধারণের একটি পদ্ধতি। এখানে কুরআন ও সহিহ হাদিসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শাফেয়ি ফিকহে কুরআনের পরে হাদিসের অবস্থান অত্যন্ত শক্ত এবং ব্যক্তিগত মতামত (রায়) ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে সংযম দেখা যায়।
এই মাজহাবের একটি বড় অবদান হলো উসুলুল ফিকহ (আইন নির্ণয়ের নীতিমালা) সুসংহত করা। ইমাম শাফেয়িই প্রথম কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস—এই চার উৎসকে সুস্পষ্টভাবে ফিকহ নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
ভৌগোলিকভাবে শাফেয়ি মাজহাব বর্তমানে অনুসৃত হয়—
- মিশর
- ইন্দোনেশিয়া
- মালয়েশিয়া
- ইয়েমেন
- পূর্ব আফ্রিকার কিছু অঞ্চল (সোমালিয়া, কেনিয়া)
- দক্ষিণ ভারতের অংশবিশেষ
সংক্ষেপে বলা যায়, শাফেয়ি হলো ইসলাম ধর্মের ভেতরে গড়ে ওঠা একটি আইনগত ধারা (ফিকহি মাজহাব)—যা মুসলমানদের ইবাদত, লেনদেন ও দৈনন্দিন জীবনের বিধান নির্ধারণে সহায়ক, কিন্তু এটি কোনো আলাদা ধর্ম বা বিশ্বাসগত দল নয়।
হাম্বলি (Hanbali) — একটি ফিকহি ধারা/মাজহাব
শাফেয়ি মাজহাবের মতো হাম্বলিও ইসলাম ধর্মের কোনো আলাদা শাখা বা বিশ্বাসগত দল নয়। এটি সুন্নি ইসলামের চারটি প্রধান ফিকহি মাজহাবের একটি। এই মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.) (৭৮০–৮৫৫ খ্রি.)—যিনি হাদিসশাস্ত্রে তাঁর কঠোরতা ও সততার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
হাম্বলি মাজহাবের বৈশিষ্ট্য হলো কুরআন ও সহিহ হাদিসের প্রতি অত্যন্ত দৃঢ় আনুগত্য। এই ধারায় ব্যক্তিগত যুক্তি (রায়) ও কিয়াস ব্যবহারে সংযম দেখা যায় এবং যেখানে সরাসরি কুরআন–সুন্নাহর দলিল পাওয়া যায়, সেখানে ব্যাখ্যা বা মতভেদের সুযোগ সীমিত রাখা হয়। ফলে এটি তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে রক্ষণশীল ফিকহি মাজহাব হিসেবে পরিচিত।
হাম্বলি মাজহাব ইজমা (সম্মিলিত ঐকমত্য) গ্রহণ করে, তবে সাহাবায়ে কেরামের মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। দুর্বল হাদিসও (যদি জাল না হয়) কখনো কখনো কিয়াসের ওপর অগ্রাধিকার পায়—এটি এই মাজহাবের একটি স্বতন্ত্র দিক।
ভৌগোলিকভাবে হাম্বলি মাজহাব প্রধানত অনুসৃত হয়—
- সৌদি আরব
- কাতার
- সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু অংশ
- ইরাক ও সিরিয়ার সীমিত অঞ্চলে
সংক্ষেপে, হাম্বলি মাজহাব হলো ইসলাম ধর্মের ভেতরে গড়ে ওঠা একটি কঠোরভাবে কুরআন–সুন্নাহনির্ভর আইনগত ধারা, যা মুসলমানদের ইবাদত ও সামাজিক জীবনের বিধান নির্ধারণে ভূমিকা রাখে—কিন্তু এটি কোনো আলাদা ধর্ম বা আকিদা নয়।
আরও পড়ুনঃ








Leave a Reply