আইনের সীমা, সংবিধান ও রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা
ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT-1) থেকে সম্প্রতি কিছু সেনা কর্মকর্তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনাটি আইনি ও সাংবিধানিক পরিসরে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে—আইসিটি কি সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বিচার করার এখতিয়ার রাখে?
আর যদি রাখে, তার আইনগত ভিত্তি কী?
আইসিটি আইনের জন্ম ও সীমারেখা
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ (The International Crimes (Tribunals) Act, 1973) প্রণয়ন করা হয় এক বিশেষ উদ্দেশ্যে—
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা।
এই আইনের প্রস্তাবনায় স্পষ্ট বলা আছে—
“…for the detention, prosecution and punishment of persons for genocide, crimes against humanity, war crimes and other crimes under international law committed in the territory of Bangladesh in 1971.”
অতএব, এই আইন মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
এটি কোনো সমসাময়িক অপরাধ বা রাষ্ট্রীয় কার্যাবলীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
সুতরাং, যদি কোনো সেনা কর্মকর্তা স্বাধীন বাংলাদেশের সময়কালে কোনো কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত হন, তাহলে ICT Act, 1973-এর অধীনে তার বিচার করা আইনগতভাবে এখতিয়ারবহির্ভূত (ultra vires) হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সাম্প্রতিক সংশোধন—আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন
২০২৪ সালের শেষভাগে (অন্তর্বর্তী সরকারের সময়) ICT আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধন করে আদালতের এখতিয়ার “সমসাময়িক মানবতাবিরোধী অপরাধ” পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সেনা কর্মকর্তাদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারীর আগে আইনটি আরেক দফা সংশোধন করা হয়।
তবে আইনজ্ঞদের মতে, এই সংশোধনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(১) অনুযায়ী—
“সার্বভৌমত্ব জনগণের এবং জনগণের নিকট হইতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সকল উৎস উৎসারিত।”
অর্থাৎ, শুধুমাত্র গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারই আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের ক্ষমতা রাখে।
যদি কোনো অন্তর্বর্তী বা অনির্বাচিত সরকার সাংবিধানিক অনুমোদন ব্যতীত আইন সংশোধন করে, তাহলে তা আইনি বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারে এবং আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য হয়ে ওঠে।
ফলে, সংশোধিত ICT আইনের আওতায় বিচার কার্যক্রম পরিচালনার সাংবিধানিক ভিত্তি আইনজ্ঞ মহলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
সেনাবাহিনীর নিজস্ব আইন ও এখতিয়ার
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কার্যাবলি ও শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রিত হয় The Army Act, 1952 অনুযায়ী।
এই আইনের ধারা ৪১–৮১ পর্যন্ত রয়েছে অপরাধ, তদন্ত ও কোর্ট মার্শালের বিস্তারিত বিধান।
ধারা ৪১(১) অনুসারে—
“Any person subject to this Act who commits any civil offence while on active service shall be deemed to be guilty of an offence against this Act and shall be tried by a court-martial.”
অর্থাৎ, যদি কোনো সেনা কর্মকর্তা কর্তব্যরত অবস্থায় কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হন, তার বিচার করতে হবে কোর্ট মার্শাল–এর মাধ্যমে।
সাধারণ আদালত বা আইসিটির এখতিয়ার তখন প্রযোজ্য হয় না, যতক্ষণ না রাষ্ট্রপতি বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে স্পষ্ট অনুমোদন প্রদান করে।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬১(১) বলছে—
“সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হইবেন রাষ্ট্রপতি।”
অতএব, সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো বিচার শুরু করার পূর্বে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ব্যতীত কোনো আদালতের পদক্ষেপ সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা আইনগতভাবে যাচাইযোগ্য একটি প্রশ্ন।
উল্লেখ্য, সেনাবাহিনীতে বিচারকার্যে আইনী সহায়তার “জাজ এডভোকেট জেনারেল” নামে একটি আইন বিভাগও আছে যার প্রধান একজন মেজর জেনারেল।
আদেশ পালন ও ব্যক্তিগত দায়—আন্তর্জাতিক নীতিমালা
আন্তর্জাতিক সামরিক আইনেও (যেমন Nuremberg Principles, Principle IV) বলা আছে—
“The fact that a person acted pursuant to order of his government or of a superior does not relieve him from responsibility, provided a moral choice was possible.”
তবে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, “manifestly unlawful” বা প্রকাশ্য বেআইনি আদেশের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি প্রযোজ্য নয়।
অর্থাৎ, যদি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ আইনসিদ্ধ হয় এবং কর্তব্য পালনের অংশ হিসেবে তা বাস্তবায়িত হয়, তবে ব্যক্তিগত দায় আরোপ করা যায় না।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আইনসিদ্ধ আদেশ মেনে কাজ করেছেন—এটি যদি সত্য হয়, তাহলে তাদের কর্মকাণ্ডকে ব্যক্তিগত মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে কি গণ্য করা যায়?
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠানিক মর্যাদা
সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের অন্যতম স্পর্শকাতর ও সার্বভৌম প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান।
তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা আইনি অস্পষ্টতার ভিত্তিতে মামলা করা মানে শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কাঠামোর ওপর আঘাত।
এ ধরনের উদ্যোগ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ মনোবল দুর্বল করে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে।
স্বাধীনতা রক্ষার মূল চেতনা হলো—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মান ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, প্রতিশোধ নয়।
আইনি বৈধতা ও সংবিধানিক রায়
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী কোনো সরকার যদি সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে গঠিত হয়, তাহলে তার গৃহীত আইন বা পদক্ষেপ আদালতে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
এই নীতি Bangladesh Italian Marble Works Ltd. vs Government of Bangladesh (2010 – 62 DLR (AD) 298) মামলার রায়ে পুনঃনিশ্চিত হয়েছে।
অতএব, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে যেকোনো বিচার প্রক্রিয়া সংবিধান ও প্রযোজ্য আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পরিচালনা করতে হবে—এটাই রাষ্ট্রীয় ন্যায়ের মূল শর্ত।
উপসংহার
আইনের শাসন মানে কেবল অপরাধের বিচার নয়; বরং সঠিক আদালত, সঠিক প্রক্রিয়া ও বৈধ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিচার সম্পন্ন হওয়া।
আইসিটি আইন মূলত যুদ্ধাপরাধীদের জন্য প্রণীত, সেটি পরবর্তীকালে সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা আইনি ও সাংবিধানিকভাবে বিতর্কিত হতে পারে।
যদি কোনো অভিযোগ সত্যিই থেকে থাকে, তার তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত Army Act-এর আওতায়, রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে, কোর্ট মার্শাল প্রক্রিয়ায়।
না হলে এটি কেবল বিচার নয়—রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ও মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
স্বাধীনতার পক্ষের অবস্থান মানে শুধুই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ নয়; বরং ন্যায়, আইন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম।
যে বাহিনী স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত রাখে, তাকে দুর্বল করা মানে স্বাধীনতাকেই বিপন্ন করা।
সংক্ষিপ্ত রেফারেন্স
- The International Crimes (Tribunals) Act, 1973 – Preamble & Section 3
- The Army Act, 1952 – Sections 41–81
- Bangladesh Constitution – Articles 7(1), 61(1), 63
- Nuremberg Principles, Principle IV
- Bangladesh Italian Marble Works Ltd. vs Govt. of Bangladesh (2010) – 62 DLR (AD) 298








Leave a Reply