ভূমিকা
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগের অপসারণ এবং পরবর্তী দমন–পীড়নের প্রেক্ষাপটে এবার দলটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (International Criminal Court – ICC)–এর দ্বারস্থ হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর, লন্ডনের আইন ফার্ম Doughty Street Chambers আদালতের প্রসিকিউটরের কাছে Article 15 Communication জমা দিয়েছে—যেখানে বাংলাদেশের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ (Crimes against Humanity) সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগের সারসংক্ষেপ
আইনজীবী Steven Powles KC এবং তার সহকর্মীরা দাখিলকৃত নথিতে উল্লেখ করেছেন যে,
“২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের শত শত নেতা–কর্মীকে হত্যা, হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার ও কারাগারে নির্যাতন করা হয়েছে।”
অভিযোগে বলা হয়েছে —
- অন্তত ৪০০ জন আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মী নিহত হয়েছেন;
- ২৫ জন কারাবন্দি অবস্থায় মারা গেছেন, অনেকের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে;
- ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে “Operation Devil’s Hunt” নামে একটি অভিযান চালানো হয়, যেখানে প্রায় ১৮,০০০ জনকে আটক করা হয়েছে;
- ২০২৪ সালের অক্টোবরে তথাকথিত “Immunity Order” জারি করা হয়েছিল, যা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার থেকে রেহাই দেয় এবং আরও সহিংসতা উসকে দেয়।
আবেদনকারীদের ভাষায় এই সব কার্যক্রম “রাজনৈতিক দমননীতি এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছেছে।”
আইনি কাঠামো: Article 15 কী?
Rome Statute–এর Article 15 অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র, সংস্থা বা ব্যক্তি আদালতের প্রসিকিউটরকে অভিযোগ (communication) দিতে পারে যদি তারা মনে করে কোনো সদস্যরাষ্ট্রে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
এই Communication দাখিল মানেই ICC তৎক্ষণাৎ তদন্ত শুরু করবে — তা নয়; বরং প্রসিকিউটর প্রাথমিক যাচাই (preliminary examination) শেষে তদন্তের অনুমতি চাইবেন আদালতের বিচারকদের কাছ থেকে।
বাংলাদেশ ২০১০ সালে রোম স্ট্যাটিউটে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে; ফলে ICC এখতিয়ারভুক্ত একটি দেশ হিসেবে আদালত চাইলে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করতে পারে।
রাজনৈতিক পটভূমি
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে এক অস্থায়ী প্রশাসন গঠিত হয়, যা “নির্বাচন পুনর্বিন্যাস” ও “অবাধ সংস্কার”–এর নামে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন দেশত্যাগে বাধ্য হন এবং পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে অবস্থান নেন বলে জানা যায়।
২০২৫ সালের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা Amnesty International, Human Rights Watch এবং Al Jazeera–র রিপোর্টে “mass arrests”, “targeted killings” এবং “systematic persecution”–এর অভিযোগ ওঠে।
এখন আওয়ামী লীগ সেই অভিযোগগুলোকেই আইনি ভিত্তিতে রূপ দিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরেছে।
ড. ইউনুসের ভূমিকা প্রসঙ্গে
আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেছে যে, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুস, যিনি বর্তমানে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রধান উদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন, তিনি “রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের একটি বৈশ্বিক আড়াল” তৈরি করেছেন এবং ICC–তে সম্ভাব্য অভিযোগ এড়াতে বিদেশি সহায়তা ব্যবহার করছেন।
দলের দাবি, দেশের ভেতরে “গণহত্যা ও রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান” চলছে, যার মূল লক্ষ্য আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ICC–এর দপ্তর এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত শুরু করেনি, তবে Office of the Prosecutor (OTP) বিষয়টি “under review”–এ রেখেছে বলে লন্ডনভিত্তিক আইনজীবী দল নিশ্চিত করেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম The Guardian এবং Reuters জানিয়েছে, এটি যদি গ্রহণ করা হয়, তাহলে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দমননীতি আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারিক বিবেচনায় আসবে।
এর সম্ভাব্য প্রভাব
- রাজনৈতিকভাবে: আওয়ামী লীগের জন্য এটি একটি বড় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অবস্থান পুনঃনির্মাণের কৌশল।
- আইনগতভাবে: যদি ICC তদন্ত শুরু করে, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হতে পারে।
- কূটনৈতিকভাবে: বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনের বৈধতা ও মানবাধিকার রেকর্ড প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
- নৈতিকভাবে: এটি জাতীয় রাজনীতিতে “বিচারের আন্তর্জাতিকীকরণ”–এর একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত—যেখানে একটি দল দেশের ভেতরে বিচার না পেয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের আশ্রয় নিয়েছে।
আওয়ামী লীগের এই পদক্ষেপকে কেউ কেউ “আন্তর্জাতিক কৌশলগত পুনরুত্থান” বলে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন এটি “রাজনৈতিক আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা।”
তবে নিঃসন্দেহে এই মামলার নিষ্পত্তি বা পরবর্তী ধাপ বাংলাদেশের রাজনীতি, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।








Leave a Reply