উপক্রমণিকা
ইতিহাসে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই প্রায়ই আদালত, বিচার ও রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তির রূপ পায়। বিশেষত নারী শাসকদের ক্ষেত্রে—যাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের রক্ষণশীল কাঠামোর জন্য কখনও প্রতীকী হুমকি হিসেবে দেখা হয়েছে—তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, ষড়যন্ত্র বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণে বিচার প্রক্রিয়াকে বারবার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিশ্বে ইতোপূর্বে ১৬ শতাব্দিতে লেডি জেন গ্রে নাম্মী ইংল্যান্ডের এক নারীকে এবং স্কটল্যান্ডের রানী মেরিকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিলো। প্রায় ৫০০ বছর পর ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই দন্ডে দন্ডিত করা হলো।
এই লেখায় উপরে উল্লেখিত তিনজন শাসকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়া এবং ন্যায্যতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচিত হয়েছে—যাদের বিচার নানা প্রশ্ন, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং প্রক্রিয়াগত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
১। লেডি জেন গ্রে (Lady Jane Grey)
অভিযোগ
- মাত্র ৯ দিনের জন্য ইংল্যান্ডের “রানী” ঘোষণা করা হয়; অভিযোগ—সিংহাসন দখল (usurpation) ও রাষ্ট্রদ্রোহ।
- তার ক্ষমতায় আসা ছিল প্রোটেস্ট্যান্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পরিকল্পনার অংশ।
বিচারের সমস্যা
- বিচার দ্রুত, রাজনৈতিক ও পূর্বনির্ধারিত ছিল।
- তার নিজস্ব ভূমিকা ছিল সীমিত। মূল পরিকল্পনাকারীরা ছিল ডাডলি পরিবার ও অন্যান্য প্রভাবশালী লর্ডরা।
- তিনি নিজের প্রতিরক্ষার জন্য পূর্ণ সুযোগ পাননি। আদালত ছিল রানি মেরি–১-এর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বোঝানোর উপায়।
মূল্যায়ন
লেডি জেন গ্রের বিচার আইনগত ছিল বলে দাবি করা হলেও প্রকৃত অর্থে এটি ছিল প্রতিশোধমূলক রাজনৈতিক স্থিতি রক্ষার সিদ্ধান্ত। তার দোষ প্রমাণের যথেষ্ট ভিত্তি না থাকলেও শাস্তি দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রের স্থিতি নিশ্চিত করতে।
২। মেরি, স্কটল্যান্ডের রানী (Mary, Queen of Scots)
অভিযোগ
- এলিজাবেথ–১-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র, বিশেষত Babington Plot-এ জড়িত থাকার অভিযোগ।
- ইংল্যান্ডের সিংহাসনের সম্ভাব্য দাবিদার হওয়ায় তাকে “রাজনৈতিক হুমকি” হিসেবে দেখা হয়েছিল।
বিচারের সমস্যা
- প্রমাণ গোপন রাখা হয়েছিল; তার নিজস্ব চিঠি বা কাগজপত্র দেখার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
- আইনগত পরামর্শদাতা (counsel) নিয়োগ করতে দেওয়া হয়নি।
- বিচারকরা ছিলেন এলিজাবেথের ঘনিষ্ঠ, যাদের অধিকাংশই রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন।
মূল্যায়ন
মেরিকে বিচারের মাধ্যমে নয়, রাজনীতির মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল—এ রায় ছিল এলিজাবেথের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও ধর্মীয় রাজনীতির মিলিত ফল। স্বচ্ছ বিচার তার প্রাপ্যতায় ছিল অনুপস্থিত।
৩। শেখ হাসিনা (বাংলাদেশ)
(সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত রায়ের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ)
অভিযোগ
- ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় শক্তি অতিরিক্তভাবে ব্যবহারের নির্দেশ।
- বেসামরিক নাগরিক হত্যাকাণ্ড, গুম এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনকে “রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ” হিসেবে পরিচালনা।
- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতে—তিনি ছিলেন “mastermind” বা মূল পরিকল্পনাকারী।
বিচার প্রক্রিয়া: বিতর্ক ও প্রশ্ন
১) রাজনৈতিক পরিবেশ
- সরকার পতনের অল্প সময়ের মধ্যেই বিচার শুরু হয়—অত্যন্ত উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশে।
- সমর্থকদের দাবি: বিচারটি “রাজনৈতিক প্রতিশোধ, অস্বচ্ছ ও অনিয়মতান্ত্রিক।
২) অনুপস্থিতিতে বিচার (in absentia)
- শেখ হাসিনা ছিলেন নির্বাসনে; আদালতে উপস্থিত হননি।
- in absentia বিচার আন্তর্জাতিকভাবে আইনসঙ্গত হলেও, আত্মরক্ষার সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হয়।
৩) প্রতিরক্ষা দলের প্রশ্ন
- তার আইনজীবী দলের উপর সীমাবদ্ধতা ছিল বলে সমর্থকরা দাবি করেছেন।
- সপ্রণোদিত আইনজীবীদের অংশগ্রহণে বাধা দেয়া হয়েছে।
- রাষ্ট্র প্রদত্ত আইনজীবীরা কতটা স্বাধীন ছিলেন—এই প্রশ্নও বারবার উঠেছে।
৪) প্রমাণ ও যুক্তি
পক্ষে:
- ফোন রেকর্ডিং
- ডিজিটাল নজরদারি প্রমাণ
- প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য
- ফরেনসিক প্রতিবেদন
বিপক্ষে:
- সাক্ষ্য নির্বাচন হয়েছে রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে — এমন অভিযোগ।
- দ্রুত বিচার; বৃহৎ পরিসরের ঘটনার সুষ্ঠু অনুসন্ধান নিয়ে সন্দেহ।
- ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব নিরপেক্ষতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ এখনো পুরোপুরি প্রকাশ হয়নি।
মূল্যায়ন
- বিচা্রে রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট—বিশেষত ঘটনার সময়কাল, মামলার গতি এবং in absentia প্রক্রিয়া বিচারকে বিতর্কিত করে।
- আত্মরক্ষা সীমিত ছিল; মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর শাস্তি দিতে গেলে অধিকতর কঠোর আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা উচিত ছিল।
- বিচার আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ছাড়া সম্পন্ন হওয়ায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না—এ প্রশ্নের শেষ উত্তর সময় দেবে।
সামগ্রিক তুলনা
| বিষয় | মেরি স্টুয়ার্ট | লেডি জেন গ্রে | শেখ হাসিনা |
| প্রেক্ষাপট | ধর্মীয় গৃহযুদ্ধ ও টিউডর রাজনীতি | সিংহাসন দখল-পরবর্তী ক্ষমতা লড়াই | সরকার পতন, জাতীয় অস্থিরতা |
| সবচেয়ে বড় সমস্যা | প্রতিরক্ষা অধিকার নেই | বিচার পূর্বনির্ধারিত | রাজনৈতিক পরিবেশ অনুপস্থিতিতে বিচার |
| শাস্তি | মৃত্যুদণ্ড (মাথা কাটা) | মৃত্যুদণ্ড | মৃত্যুদণ্ড |
| বিচার স্বচ্ছতা | নিম্ন | নিম্ন | মিশ্র — বিতর্কিত |
| রাজনৈতিক প্রভাব | খুব বেশি | খুব বেশি | খুব বেশি |
উপসংহার
তিনটি ক্ষেত্রেই দেখা যায়—নারী শাসকদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া কেবল আইনগত নয়, গভীরভাবে রাজনৈতিক।
- মেরির বিচার কাগজে আইন ছিল, কিন্তু বাস্তবে ছিল শত্রু নির্মূল।
- জেন গ্রের বিচার ছিল ক্ষমতা রক্ষার জন্য তরুণী রাজকন্যাকে বলি দেওয়া।
- আর শেখ হাসিনার বিচার—আধুনিক রাষ্ট্রে হলেও—রাজনৈতিক অস্থিরতা, দ্রুত বিচার এবং অনুপস্থিতির কারণে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার প্রশ্নে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে:
যেখানে আইন ও রাজনীতি মিলেমিশে এক হয়, সেখানে বিচার প্রক্রিয়া কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে পারে না।
সূত্রসমূহঃ








Leave a Reply