বাংলাদেশে বর্তমানে যে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে ঘটে যেতে পারে বড় ধরণের বিদ্রোহ। বাংলাদেশের গ্রামের মানুষ আগে গাছ কেটে লাকড়ি বানিয়ে ব্যবহার করতো সম্পদশালী পরিবারে। অভিজাত শ্রেণীর ঘরে কয়লাও ব্যবহৃত হতো। এছাড়া অধিকাংশ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারেই পাটের খড়ি, শুকনো কলাপাতা, আমপাতা ইত্যাদি কুড়িয়ে লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করতো।
বাংলাদেশে গ্যাসের চুলায় রান্নার প্রচলন হয় স্বাধীনতার পর থেকেই। এর আগে গ্যাস আবিস্কার হলেও রাজধানীতে উচ্চ লেভেলে টুকটাক ব্যবহার হলেও সাধারণের ভাগ্যে তা জুটতো না। বর্তমানে গ্রচমাঞ্চলের মানুষও গ্যাসের চুলায় রান্না করে। যে এলাকায় গ্যাস লাইন নাই সে এলাকায় এলপিজি। সক্ষম পরিবার মাত্রই গ্যাসের চুলা ব্যবহার করে।
যারা পুরোপুরি গ্যাসনির্ভর না, চুলায় রান্না করে তাদের বাড়িতেও রাতের খাবার গরম করার জন্য অন্তত সিলিন্ডার রাখা হয়। এই অবস্থায় দেশে যে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে তার প্রভাব গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পড়ছে। এমনিতেই দেশের লাখ লাখ মানুষ কর্মশূণ্য হয়ে পড়েছে, এসব ঘটনার দ্রুত সমাধান না করতে পারলে ঘটনা কোথায় পৌঁছতে পারে তা বর্তমান ড: মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃতাধীন নিস্কর্মা অন্তর্বর্তীকালিন সরকার টেরও পাচ্ছে না।
এ প্রসংগে ফ্রান্সে রুটির জন্য ঘটে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক বিদ্রোহের ঘটনা নিম্নে উল্লেখ করছি।
ক্ষুধা থেকে জন্ম নেয়া এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহ
প্যারিস, ১৭৮৯ — ফ্রান্সে যখন রাজপ্রাসাদে রাজা ও অভিজাতরা বিলাসে ডুবে, তখন দেশের সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলো রুটির লাইনে। এক টুকরো রুটির অভাবে ক্ষুধার্ত জনতার অসন্তোষই শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিপ্লব—ফরাসি বিপ্লবে।
১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব কেবল রাজতন্ত্রের পতনের ঘটনা নয়; এটি ছিলো ক্ষুধা, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বিস্ফোরণ। আর এই বিস্ফোরণের কেন্দ্রে ছিলো একটি সাধারণ খাদ্য—রুটি।
রুটি: ফরাসি জীবনের মূল ভিত্তি
১৮শ শতকে ফ্রান্সে রুটি ছিলো মানুষের প্রধান খাদ্য। একজন শ্রমজীবী মানুষ তার আয়ের প্রায় ৫০–৮০ শতাংশ ব্যয় করতো রুটি কিনতে। ফলে রুটির দাম সামান্য বাড়লেই তা সরাসরি জীবন-মরণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়া্তো।
১৭৮৮–৮৯ সালে ভয়াবহ শীত, খারাপ ফসল ও বাজারে কৃত্রিম সংকটের কারণে রুটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অনেক শহরে এক টুকরো রুটির দাম হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
ক্ষুধা যখন রাজনীতিতে রূপ নেয়
প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে শুরু হয় রুটির জন্য বিক্ষোভ। নারীরা বিশেষভাবে এই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন। কথিত আছে নারীরা রুটি বানানোর বেলনা হাতে বিক্ষোভে নামে। ১৭৮৯ সালের ৫ অক্টোবর, হাজার হাজার ক্ষুধার্ত নারী “রুটি চাই” স্লোগান তুলে ভার্সাই প্রাসাদের দিকে মিছিল করেন।
এই মিছিল কেবল খাদ্যের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তারা রাজা ষোড়শ লুইকে বাধ্য করেন প্যারিসে ফিরে আসতে। কার্যত এই ঘটনার মাধ্যমেই রাজতন্ত্রের কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে।
“রুটি না থাকলে কেক খাক”—একটি প্রতীকী উক্তি
রানী মারি অঁতোয়ানেতের নামে প্রচলিত উক্তি—“রুটি না থাকলে কেক খাক”—ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত হলেও এটি সাধারণ মানুষের চোখে শাসকশ্রেণির বাস্তবতা-বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হয়ে ওঠে। ক্ষুধার্ত জনগণ এটিকে অপমান হিসেবে গ্রহণ করে, যা ক্ষোভ আরও উসকে দেয়।
অর্থনৈতিক সংকট ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা
ফ্রান্স তখন ঋণে জর্জরিত। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে বিপুল অর্থ ব্যয়, কর ব্যবস্থার বৈষম্য এবং রাজকীয় অপচয় রাষ্ট্রকে দেউলিয়া করে তোলে। কিন্তু করের বোঝা পড়ে তৃতীয় শ্রেণির মানুষের ওপর, যারা আগে থেকেই ক্ষুধার্ত।
রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের ন্যূনতম খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের বৈধতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে—ফরাসি বিপ্লব তারই বাস্তব উদাহরণ।
বিপ্লব গড়ায় রুটি থেকে অধিকারে
রুটির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত রূপ নেয় বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগ্রামে। জন্ম নেয় “স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব”-এর আদর্শ। পতন ঘটে রাজতন্ত্রের, প্রতিষ্ঠা পায় প্রজাতন্ত্র।
১৭৯৩ সালে রাজা ষোড়শ লুইয়ের শিরচ্ছেদ ছিলো সেই দীর্ঘ ক্ষুধা ও বঞ্চনার চূড়ান্ত পরিণতি।
ইতিহাসের শিক্ষা
ফরাসি বিপ্লব প্রমাণ করে—
ক্ষুধা কেবল মানবিক সংকট নয়, এটি রাজনৈতিক বিস্ফোরণেরও উৎস। যখন একটি রাষ্ট্র তার জনগণকে রুটি দিতে ব্যর্থ হয়, তখন জনগণ সেই রাষ্ট্রব্যবস্থাই বদলে দিতে প্রস্তুত হয়।
দুই শতাব্দী পরও ফরাসি বিপ্লব স্মরণ করিয়ে দেয়—
খাদ্য নিরাপত্তা কোনো দয়ার বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।








Leave a Reply