—- লেখকঃ নাজমীন মোর্তুজা
বাংলাদেশে মানুষ হঠাৎ খুব ধার্মিক হয়ে গেছে গত পাঁচ ছয় বছরে হিজাব টুপির বাজার গরম ! এই ধারণাটা মূলত একটি বিভ্রান্তি। বাস্তবে ধার্মিকতা বাড়েনি, বেড়েছে তার প্রদর্শন। বিশ্বাস নয়, দৃশ্যমানতা। আত্মশুদ্ধি নয়, নৈতিক কর্তৃত্ব দেখানোর তাড়না। ধর্ম এখানে অনেকের কাছে এখন আর আত্মার অনুশীলন নয়, বরং একটি পরিচয়পত্র।
যদি সত্যিই ধার্মিকতা বাড়ত, তাহলে তার প্রতিফলন দেখা যেত আচরণে। মসজিদে নিয়মিত জামাতে, লেনদেনে সততায়, ক্ষমতায় সংযমে। রমজানের বাইরেও যদি মসজিদ ভরে থাকত, যদি অসৎ পথে বাধা তৈরি হতো, তাহলে বলা যেত সমাজ বদলাচ্ছে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। যা হচ্ছে, তা মূলত অনলাইনে।
অনলাইন এখন নতুন মসজিদ, নতুন মিম্বর। এখানে ধর্ম সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় নসিহতের নামে, বিশেষ করে মেয়েদের ঘিরে। কে কী পরবে, কী করবে, কী করবে না এই তদারকির ভেতর দিয়েই বহু মানুষ নিজের ধার্মিকতা জাহির করে। অথচ একই ব্যক্তি আবার অনায়াসে বিদেশি নারী সেলিব্রিটিদের অনুসরণ করে, তাদের ছবি লাইক করে, মন্তব্য করে। দেশি মেয়ের বেলায় যে ধর্ম কঠোর, সুবিধাজনক জায়গায় গিয়ে সেই ধর্ম অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে যায়।
এটাই আসলে দ্বিচারিতা। ধর্মের নয়, মানুষের।
এই প্রবণতার পেছনে একটা গভীর সামাজিক ক্লান্তি কাজ করছে। চাকরি নেই, সম্মান নেই, নিরাপত্তা নেই। জীবনের সঙ্গে লড়তে লড়তে মানুষ ভেঙে পড়ে। সেই ভাঙা মানুষ ধর্মের কাছে যায় শান্তির খোঁজে। ওয়াজ শোনে, ধর্মীয় পোস্ট শেয়ার করে, কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে ভালো মানুষ ভাবতে পারে। কিন্তু এই ধর্মচর্চা বেশিরভাগ সময়ই আত্মসংযম শেখায় না, শেখায় অন্যকে শাসন করতে।
যখন নিজের স্বার্থে আঘাত লাগে, তখন ধর্ম পাশে সরে যায়। সুদ, দুর্নীতি, অন্যায়, ভোগ এই জায়গাগুলোতে ধর্মের বিধান খুব একটা মনে থাকে না। কিন্তু যখন কাউকে ছোট করা যায়, দোষারোপ করা যায়, তখন ধর্ম সামনে চলে আসে পুরো শক্তি নিয়ে।
এটাই আজকের বাস্তবতা। ধর্ম এখানে নৈতিকতার পথপ্রদর্শক নয়, বরং অনেকের হাতে এক ধরনের সামাজিক অস্ত্র।
প্রকৃত ধার্মিক মানুষ এই ভিড়ে আলাদা করে চোখে পড়ে না। কারণ সে চিৎকার করে না। সে অনলাইনে ধর্ম নিয়ে কচকচানি করে না। সে আগে নিজের দিকে তাকায়, নিজের হিসাব ঠিক করে। তার ধর্ম পোস্টে নয়, অভ্যাসে। কথায় নয়, কাজে।
এই লেখাটা ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। এই লেখা সেই ভণ্ডামির বিরুদ্ধে, যা ধর্মের মুখোশ পরে সমাজে দাপট দেখায়। আর বর্তমান বাংলাদেশে সমস্যাটা ধর্মের ঘাটতি নয় সমস্যা হলো বিবেকের অনুপস্থিতি।
এই প্রসঙ্গে একটা গল্প বলছি -মসজিদের সামনের মুদি দোকানটার মালিক ইউনুস আলী। সবাই তাকে খুব ধার্মিক মানুষ বলেই চিনত। সাদা টুপি, লম্বা জুব্বা, দাড়িতে নিয়মিত তেল। ফজরের আগে দোকান খুলত, আজান হলেই দোকানদারকে বলে দিত, দোকান দেখো, নামাজ পড়ে আসি।
একদিন দুপুরে দোকানের সামনে একটা মেয়ে দাঁড়াল। ওড়নাটা ঠিকমতো মাথায় ছিল না। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল,
“এইসব বেপর্দা চলবে না। আল্লাহকে ভয় করো।“
মেয়েটা চুপচাপ সরে গেল। কেউ কিছু বলল না। সবাই মাথা নেড়ে সমর্থন করল।
ঠিক তখনই দোকানের পেছন দিক থেকে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এল। লোকটা এলাকার পুরনো মানুষ, কম কথা বলে, কিন্তু চোখে অদ্ভুত শান্তি।
সে বলল,
“ভাই, সকালে তুমি যে ওজন কম দিয়ে চাল বেচলে, তখন আল্লাহকে ভয় করেছিলে?”
চারপাশে হঠাৎ নীরবতা নেমে এল।
লোকটা বিরক্ত হয়ে বলল,
“ওসব ব্যবসার হিসাব। ধর্ম আলাদা।“
বৃদ্ধ মৃদু হাসল।
“তাই নাকি? তাহলে আজকাল দেখছি ধর্মের চেয়ে টুপিই বড় হয়ে গেছে। টুপি দিয়ে মুখ ঢাকে, কিন্তু হাতের কাজ ঢাকে না।“
লোকটা আর কথা বলল না। টুপিটা একটু ঠিক করে নিল, কিন্তু চোখ নামাল না।
মুদি দোকানে কেউ আর কিছু বলল না। শুধু এক কোণে বসে থাকা ছেলেটা বুঝে গেল
সমস্যা ধর্মে না, সমস্যাটা সেই জায়গায়, যেখানে বিবেক ঢুকতে পারে না, কিন্তু টুপি ঢুকে যায়।
— লেখকঃ নাজমীন মোর্তুজা
কৈফিয়ৎঃ এই লেখাটি ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, প্রকৃত ধার্মিকের বিরুদ্ধেও নয়, সমাজের একশ্রেণীর ধর্মাশ্রয়ী প্রতারকদের বিরুদ্ধে
আরো পড়ুনঃ ইহুদি ধর্মের ববভ (bobov) হাসিদিক ধারা








Leave a Reply