২১ নভেম্বর ২০২৫, ঢাকা
আজ শুক্রবার সকাল প্রায় ১০:৩৮ মিনিটে রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল নরসিংদি জেলার কাছে, ঢাকা থেকে আনুমানিক ৪০–৫০ কিলোমিটার পূর্বে মাধবদী নামক স্থানে। আন্তর্জাতিক উৎস অনুযায়ী রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫.৭ এবং ভূ-গভীরতা আনুমানিক ১০ কিলোমিটার।
যদিও দেশজুড়ে এর প্রভাব অনুভূত হয়েছে, এক স্থানে ভবনের সানসেট ধসে পড়ে ৩ পথচারীর মৃত্যু সংবাদ পাওয়া গেছে। এছাড়া এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবুও সাম্প্রতিক এই ঘটনা ঢাকার ভূমিকম্প-ঝুঁকি নিয়ে পুনরায় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কি ঘটেছে – সংক্ষিপ্ত বিবরণ
- রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি-বেসরকারি অফিস, আবাসিক ভবন এবং বহুতল স্থাপনায় কয়েক সেকেন্ড ধরে ঝাঁকুনি অনুভূত হয়।
- বহু মানুষ আতঙ্কে ভবন থেকে নেমে বাইরে অবস্থান নেয়।
- এখনো বড় ধরনের ধ্বংসের রিপোর্ট নেই, যদিও কিছু এলাকায় ফাটল, ক্ষুদ্র দেয়ালধস বা গৃহস্থালি ক্ষতির খবর এবং এ পর্যন্ত ৩-৪ জনের মৃত্যু সংবাদ পাওয়া গেছে।
- ভারতের কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরপূর্বাঞ্চলেও হালকা কম্পন অনুভূত হয়।
ঘটনার গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। ভারতীয় প্লেট, ইউরেশীয় প্লেট ও বার্মিজ মাইক্রোপ্লেটের সংযোগস্থলে দেশটির অবস্থান—যা ভূকম্পন ঝুঁকি বাড়ায়।
কম গভীরতার ভূমিকম্প (যেমন আজকের ১০ কিমি) সাধারণত বেশি ঝাঁকুনি সৃষ্টি করে। যদিও ৫.৭ মাঝারি মাত্রার, তবে এই ধরণের কম্পন বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনার পূর্ব সংকেত হতে পারে।
ঢাকার ভূমিকম্প ইতিহাস – বড় ঘটনাগুলোর সারসংক্ষেপ
ঢাকা ও বাংলাদেশ অঞ্চলের ভূমিকম্প ইতিহাস বেশ পুরোনো। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা—
১. ১৭৬২ সালঃ Bengal–Arakan Earthquake
ম্যাগনিচিউড আনুমানিক ৮.৫ — উপকূল বরাবর বিস্তীর্ণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।
২. ১৮৮৫ সালঃ মানিকগঞ্জ ভূমিকম্প
ঢাকার খুব কাছাকাছি; ম্যাগনিচিউড প্রায় ৭.০।
৩. ১৯১৮ সালঃ সিলেট/স্রিমঙ্গল ভূমিকম্প
ম্যাগনিচিউড ৭.১ — ঢাকায়ও অনুভূত হয়েছিল।
৪. ১৯৮৮ সালঃ India–Myanmar Earthquake
ম্যাগনিচিউড ৭.৩ — ঢাকায় মাঝারি মানের কম্পন অনুভূত হয়।
গত ৫০ বছরে ঢাকার ভৌগোলিক নিকটস্থ কোনো ম্যাগনিচিউড ৬–এর ওপরে বড় ভূমিকম্প রেকর্ড নেই। এ কারণে আজকের ৫.৭ মাত্রার ঘটনা বিশেষ নজরে এসেছে।
ঢাকার ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি ও ফল্টলাইন
ঢাকা তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগ অঞ্চলের কাছে অবস্থিত:
- মধুপুর ফল্ট
- দাউকি ফল্ট
- বেঙ্গল বেসিনের সাবডাকশন জোন
এগুলোতে শক্তি জমা হওয়া একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। বড় ধরনের ভূমিকম্প সাধারণত এই শক্তি হঠাৎ মুক্ত হওয়ার ফলাফল। পাশাপাশি ঢাকার নরম মাটি (soft sediment) এবং লিকুইফিকেশন-প্রবণ এলাকাগুলো ঝুঁকি আরও বাড়ায়।
ভবিষ্যতে ঢাকায় বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে ঢাকার সম্ভাব্য ভূমিকম্প ঝুঁকিকে তিনটি স্তরে দেখা যায়:
১) মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্প (৫.৫ – ৫.৮ মাত্রা)
- ভবনের ক্ষতি সীমিত
- আহতের সংখ্যা কম
- শহর দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম
২) মাঝারি–বড় মাত্রা (৬.৫ – ৬.৯ মাত্রা)
- বিপুল সংখ্যক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত
- হাজারের বেশি প্রাণহানির সম্ভাবনা
- বিদ্যুৎ, গ্যাস, রাস্তাঘাট–সবক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা
৩) সম্ভাব্য ক্যাটাস্ট্রোফিক ভূমিকম্প (৭.০ বা তার বেশি মাত্রা)
- অগণিত ভবন ধসে পড়া
- লাখের বেশি মানুষ আহত বা বাস্তুচ্যুত
- অর্থনৈতিক ক্ষতি দেশের জিডিপির বড় অংশকে বিপর্যস্ত করতে পারে
ঢাকার ঘনবসতি ও পুরোনো নির্মাণ কাঠামো বিবেচনায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—একটি বড় ভূমিকম্প হলে উদ্ধারকাজ কঠিন হবে, কারণ অনেক এলাকা ভেঙে পড়ে সহজে প্রবেশযোগ্য নাও থাকতে পারে।
কি করা জরুরি
ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি কমাতে কিছু জরুরি উদ্যোগ:
- সীসমিক জোনিং ম্যাপ পুনর্গঠন
- পুরনো ভবনের রেট্রোফিটিং ও কোড বাস্তবায়ন
- জরুরি ুউদ্ধার টিম, অগ্নিনির্বাপণ ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস শক্তিশালী করা
- জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি
- স্কুল-কলেজ ও অফিসে ভূমিকম্প মহড়া বাধ্যতামূলক করা
ঢাকায় বড় ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যেসব এলাকা
- পুরান ঢাকা
- মগবাজার, মালিবাগ
- মোহাম্মদপুর
- মিরপুর সেকশন ৭–১২
- বাড্ডা–রামপুরা–উত্তর বাড্ডা
- শ্যামলী–কল্যাণপুর
- বসিলা–হেমায়েতপুর
- কাঁচপুর–রূপগঞ্জ বেল্ট
(কারণ: নরম মাটি, পুরোনো ভবন, ঘনত্ব)
সাধারণ জনগণের জন্য জরুরি পরামর্শ
ভূমিকম্পের সময়
✔ জানালা, কাঁচ, আলমারি, বড় ঝুলন্ত বস্তুর কাছ থেকে দূরে থাকুন
✔ মজবুত কলাম/ভীম, খাট/চৌকি, সোফা, মজবুত টেবিলের নিচে আশ্রয় নিন
✔ লিফট ব্যবহার করবেন না
✔ ভবন থেকে বের হতে দৌড়ঝাঁপ না করে কম্পন থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন
কম্পন শেষ হলে
✔ গ্যাস লাইন, বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা করুন
✔ ফাটল দেখা দিলে ভবন খালি করুন
✔ গুজব নয়—সরকারি সুত্রের তথ্য অনুসরণ করুন
সারসংক্ষেপ
ঢাকায় আজকের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প বড় ক্ষতি করেনি—এটি আশ্বস্ত হওয়ার মতো।
কিন্তু ইতিহাস, ভূ–গঠনের দুর্বলতা, ফল্টলাইন এবং নির্মাণশৈলীর কারণে ঢাকা ভবিষ্যতে মধ্য থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্পে গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে।
এখনই প্রস্তুতি জোরদার করা না হলে কয়েক মিনিটের কম্পনই লাখো মানুষের জীবন পরিবর্তন করে দিতে পারে।
উপসংহার
গত ৫০ বছরের শান্ত সময় দেখে ঢাকাকে নিরাপদ মনে করা একটি বিপজ্জনক ভুল। ইতিহাস, ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ, সক্রিয় ফল্টলাইন এবং সাম্প্রতিক কম্পনের ধারা মিলিয়ে স্পষ্ট—ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বাস্তব এবং যেকোনো সময় ঘটতে পারে। এখনই প্রস্তুতি না নিলে ভবিষ্যতের ক্ষতি হবে অপ্রতিরোধ্য।
সূত্রঃ Wikipedia https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_earthquakes_in_Bangladesh








Leave a Reply