ইউরোপীয় নাচের প্লেগের ইতিহাস
ইউরোপের ইতিহাসে এমন এক রহস্যময় ঘটনা নথিভুক্ত রয়েছে, যেখানে হাজারের কাছাকাছি মানুষ কোনো কারণ ছাড়াই নাচতে শুরু করে এবং থামতে না পেরে অনেকে মৃত্যুবরণ করে। ইতিহাসে ঘটনাটি পরিচিত ‘নাচের প্লেগ’ (Dancing Plague) নামে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত
ইতিহাসবিদদের মতে, নাচের প্লেগ ছিল এক ধরনের অস্বাভাবিক সামাজিক ও মানসিক মহামারি। এতে আক্রান্তরা প্রকাশ্য স্থানে হঠাৎ নাচতে শুরু করত এবং দীর্ঘ সময় ধরে নাচ থামাতে পারতো না। অনেক ক্ষেত্রে এই নাচ চলতো টানা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন।
ঘটনাটি ঘটেছিলো স্ট্রাসবুর্গে ১৫১৮ সালে। সবচেয়ে ভয়াবহ ও সুপ্রামাণ্য ঘটনা ঘটে তৎকালীন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত স্ট্রাসবুর্গ শহরে (বর্তমান ফ্রান্স)।
সমসাময়িক দলিল অনুযায়ী—
এক নারী, ইতিহাসে যিনি ফ্রাউ ট্রফিয়া নামে পরিচিত, তিনি হঠাৎ রাস্তায় নাচতে শুরু করেন। কয়েক দিনের মধ্যেই তার সঙ্গে যুক্ত হয় শত শত মানুষ। এক মাসের মধ্যে নৃত্যরত মানুষের সংখ্যা পৌঁছে যায় প্রায় ৪০০ জনে।
চিকিৎসা নথি ও চার্চ রেকর্ডে উল্লেখ আছে, বহু মানুষ হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, অতিরিক্ত ক্লান্তি ও পানিশূন্যতায় মারা যায়।
ফ্রান্সের তৎকালীন প্রশাসন প্রথমে ঘটনাটিকে রোগ হিসেবে না দেখে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। তারা ধারণা করে, আক্রান্তদের শরীর থেকে “অভিশাপ” বের করতে আরও নাচ প্রয়োজন।
ফলে—
১) শহরে নাচের মঞ্চ তৈরি করা হয়
২) বাদ্যযন্ত্র ও সংগীতশিল্পীর ব্যবস্থা করা হয়
পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।
আজ পর্যন্ত সেই নাচের প্লেগের নির্দিষ্ট কারণ নিয়ে ঐকমত্য নেই। তবে গবেষকদের কয়েকটি ব্যাখ্যা রয়েছে—
১) গণ-মনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতা:
দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও ধর্মীয় আতঙ্কে জর্জরিত সমাজে মানসিক চাপ থেকে এই আচরণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২) এরগট বিষক্রিয়া:
রাই শস্যে জন্মানো বিষাক্ত ছত্রাক স্নায়ুতন্ত্রে বিভ্রম ও খিঁচুনি সৃষ্টি করতে পারে।
৩) ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভয়:
তৎকালীন ইউরোপে প্রচলিত ছিল, ‘সেন্ট ভিটাস’-এর অভিশাপে মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবে নাচতে বাধ্য হয়।
কখন এই ঘটনা বন্ধ হয়
১৭শ শতকের পর ইউরোপে এ ধরনের নাচের প্লেগের উল্লেখ আর পাওয়া যায় না। গবেষকদের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, ধর্মীয় কুসংস্কারের প্রভাব কমে যাওয়া এবং সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে এই ধরনের ঘটনা বন্ধ হয়ে যায়।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য
নাচের প্লেগ মধ্যযুগীয় ইউরোপের মানসিক ও সামাজিক সংকটের একটি বিরল দলিল। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি প্রমাণ করে—ভয়, চাপ ও কুসংস্কার কখনো কখনো সংক্রামক রোগের মতোই সমাজে ছড়িয়ে পড়তে পারে।








Leave a Reply