চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরেও একাধিক গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। দেশে এ পর্যন্ত ১৬৭ জন সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে, যা অমানবিক। এরমধ্যে সবাই উচ্চ আয়ের সাংবাদিক আছে এমন না। তাদের পরিবারের দিন কিভাবে কাটছে তা ভুক্তভোগী পরিবারই বলতে পারে। ভিন্নমত থাকলেই তার প্রতি এমন কঠোর ব্যবস্থা নেয়া কোন যুক্তিতে আছে? তাই যদি হতো তাহলে দেশের স্বাধীনতা বিরোধীরা সরকারি চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি কোনোটাই ঠিকমত করতে পারতো না।
রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি টেলিভিশন ও বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলের টকশোতে নিয়মিত অংশ নেয়া বক্তা, সাংবাদিক, শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এবং অনলাইন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের বিরুদ্ধেও মামলা ও গ্রেফতারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্য্যের বিষয় হলো, কারো নামে সুনির্দিষ্ট মামলা না থাকলেও তাদের আগে গ্রেফতার করে পরে মামলা দেয়া হচ্ছে।
এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমালোচনার পরিসর এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অভ্যুত্থানের পরে বভিন্ন সময়ে যারা গ্রেফতার হয়েছেন
অভ্যুত্থানের পরপর যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিলো তারা বাদে পরবর্তীতে যারা গ্রেফতার হয়েছেন তারা টকশো বক্তা কিংবা কোনো সেমিনারে যোগ দেয়ার অপরাধে গ্রেফতার হয়েছেন, উদাহরণস্বরূপ কয়েকজনের নাম নিচে উল্লেখ করা হলোঃ
(১) অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহঃ টেলিভিশন টকশোর পরিচিত মুখ। তিনি জানিপপ নামক নির্বাচন পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে তাঁর বক্তব্য নিয়মিত আলোচনায় থাকত। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
(২) সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীঃ মঞ্চ ৭১ নামক সংগঠনের ব্যানারে সংবিধান বিষয়ক আলোচনার অনুষ্ঠান থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়, পরে জামিনে ছাড়া পায়। তার সাথে আরো ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো।
(৩) অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান (কার্জন): আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর সাথে তাকেও গ্রেফতার করা হয়।
(৪) অবসরপ্রাপ্ত সচিব আবু আলম শহীদ খান—যিনি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন টকশোতে সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করতেন।
(৫) সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাঃ মঞ্চ ৭১ এর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার অভিযোগে তাকেও গ্রেফতার করা হয়, তবে তা ঘটনার অনেক পরে। MANCHITRA নামে তিনি একটি ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করেন।
(৬) সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর: গত পরশু (১৪ ডিসেম্বর) তাকে জিম থেকে ডিবি কার্যালয়ে তুলে নেয়া হয়। পরে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দায়ের ও গ্রেফতার করা হয়। তিনি টকশোতে সব সময় সরকারের ভুলগুলি নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে তিনি সে সরকারেরও সমালোচনা করেছেন।
(৭) এস এ সাব্বিরঃ মূলধারার গণমাধ্যমের পাশাপাশি অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতারাও এই সময়ে নজরে আসেন। কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এস এ সাব্বির গ্রেফতার হওয়ার পর মুক্তি পান।
সাংবাদিক ও মিডিয়া সংশ্লিষ্টরা
ইতোপূর্বে অভ্যুত্থানের পরপরই কয়েকজন পরিচিত সাংবাদিকের গ্রেফতার ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে, তারমধ্যে নিম্নোক্ত কয়েকজন উল্লেখযোগ্য
(১) ভোরের কাগজ-এর সম্পাদক জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনায় সাংবাদিক মহলে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
(২) একাত্তর টিভির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু-ও একই সময়ে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আসেন।
(৩) সাংবাদিক ও একাত্তর টিভির উপস্থাপক ফারজানা রূপা
(৪) একাত্তর টিভির শাকিল আহমেদ
শেষোক্ত দুইজনের বিরুদ্ধেও মামলা ও গ্রেফতার করা হয়, যা মিডিয়া অঙ্গনে আলোড়ন তোলে।
অন্য নাম ও বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
এই তালিকার বাইরেও আরও কিছু নাম বিভিন্ন সময়ে তদন্ত, মামলা, নজরদারি কিংবা প্রশাসনিক পদক্ষেপের আওতায় এসেছে বলে আলোচনা রয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব গ্রেফতার ও মামলা নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এবং আইনের স্বাভাবিক প্রয়োগের অংশ। অন্যদিকে সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ মনে করছে, একই সময়ে এতজন টকশো বক্তা ও সমালোচক কণ্ঠ আইনি চাপে পড়া একটি বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।
পরিশেষে
রাষ্ট্র চাইলে কয়েকজন পরিচিত টকশো বক্তা বা সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে, তাঁদের গ্রেফতারও করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় লক্ষ-কোটি কণ্ঠ, বিদেশে অবস্থানরত বিশ্লেষক ও প্রবাসী বাংলাদেশি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি ও প্রশ্নকে একসাথে থামানো সহজ নয়।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে—
গ্রেফতার কি সত্যিই সমালোচনাকে থামাতে পারে, নাকি তা নতুন করে আরও বিস্তৃত আলোচনার জন্ম দেয়?








Leave a Reply