একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে দুই পরাশক্তির মধ্যে যুদ্ধ বেধে যেতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ ১৮৫৯ সালে ব্রিটেন ও আমেরিকার মধ্যকার “পিগ ওয়ার”।
ইতিহাসে যুদ্ধের কারণ হিসেবে রাজনীতি, ধর্ম, সাম্রাজ্যবাদ বা সম্পদের নামই বেশি শোনা যায়। কিন্তু পৃথিবীতে এমন ঘটনাও ঘটেছে—একটি শূকর হত্যা থেকেই দুই পরাশক্তির মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো। ইতিহাসে এই অদ্ভুত ঘটনাটি “পিগ ওয়ার” (Pig War) নামে পরিচিত।
পটভূমি: সীমান্ত নিয়ে পুরনো বিরোধ
১৮৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ওরেগন চুক্তি (Oregon Treaty)। এই চুক্তির মাধ্যমে বর্তমান ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য ও কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু চুক্তিতে একটি জায়গা অস্পষ্ট থেকে যায়—
সান হুয়ান দ্বীপপুঞ্জ (San Juan Islands) কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে?
এই দ্বীপপুঞ্জ ছিলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে তখন ব্রিটিশ ও মার্কিন উভয় নাগরিক বসবাস করতেন।
একটি শূকর হত্যাকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত
১৮৫৯ সালের জুন মাসে সান হুয়ান দ্বীপে বসবাসকারী এক মার্কিন কৃষক লাইম্যান কাটলার লক্ষ্য করেন—একটি শূকর বারবার তার আলুর ক্ষেতে ঢুকে ফসল নষ্ট করছে।
শেষ পর্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি শূকরটিকে গুলি করে হত্যা করেন।
সমস্যা শুরু হয় তখনই।
শূকরটি ছিল ব্রিটিশ হাডসনস বে কোম্পানির এক কর্মচারীর মালিকানাধীন। ব্রিটিশ পক্ষ দাবি করে—
শূকর হত্যার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
কাটলার ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন,
“আমার জমিতে ঢুকে ফসল নষ্ট করছিলো—তাই মেরেছি।”
উত্তেজনা সামরিক রূপ নেয় এবং যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে
ঘটনাটি দ্রুত কূটনৈতিক রূপ নেয়।
(১) ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ কাটলারকে গ্রেপ্তারের হুমকি দেয়
(২) মার্কিন বসতি স্থাপনকারীরা নিরাপত্তা চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর সাহায্য চান
(৩) যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপে সেনা মোতায়েন করে
(৪) পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশ নৌবাহিনী যুদ্ধজাহাজ পাঠায়
এক সময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে—
দুই দেশের হাজারের বেশি সৈন্য, কামান ও যুদ্ধজাহাজ মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে।
সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে—একটি মৃত শূকর।
অবশেষে যুদ্ধ হলো না
সৌভাগ্যক্রমে উভয় পক্ষের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা সংঘর্ষে যেতে অস্বীকৃতি জানান। কেউই প্রথম গুলি চালানোর দায় নিতে চাননি।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন সিদ্ধান্ত নেয়—
(১) দ্বীপে যৌথ সামরিক উপস্থিতি থাকবে
(২) বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে সমাধান করা হবে
এই অচলাবস্থা চলে প্রায় ১২ বছর।
চূড়ান্ত সমাধান
১৮৭২ সালে জার্মান সম্রাট কাইজার উইলহেল্ম প্রথম–কে সালিশকারীর ভূমিকা দেওয়া হয়। তিনি রায় দেন— সান হুয়ান দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে যাবে।
এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত সীমান্ত সংকটগুলোর একটি।
পিগ ওয়ারের বিশেষত্ব
(১) কোনো যুদ্ধ হয়নি
(২) একজন মানুষও মারা যায়নি
(৩) একমাত্র প্রাণহানি—একটি শূকর
তবু এটি ইতিহাসে যুদ্ধ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে, কারণ একটি তুচ্ছ ঘটনাই কীভাবে আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিতে পারে—তার জ্বলন্ত উদাহরণ এটি।
উপসংহার
“পিগ ওয়ার” আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
যুদ্ধ সব সময় বড় আদর্শ বা মহান লক্ষ্য থেকে আসে না।
কখনো কখনো একটি ছোট ভুল, ক্ষোভ বা অহংকারই ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
একটি শূকর, একটি আলুর ক্ষেত—আর দুই সাম্রাজ্যের মুখোমুখি অবস্থান।
ইতিহাস সত্যিই কখনো কখনো অবিশ্বাস্য।
সূত্রঃ ইন্টারনেট








Leave a Reply