খাজা মইনুদ্দিন চিশতির দরগায় প্রবেশ করার মুহূর্তেই ভেতরে দেখতে
পেলাম এক অন্যরকম পরিবেশ। হাজারো মানুষের ভিড়—কারো প্রার্থনা, কেউ আবার
পূণ্যার্থীর সরলতার সুযোগে সওয়াব ‘বিকোতে’ মজমা জমিয়েছে। কারো চোখে জল, কারো হাতে
ফুল ও চাদর, কেউ আছে নিজস্ব ধান্ধায়।
মাজার শরীফের বারান্দায় এক শ্রেণীর পূণ্যার্থী মাজারের দিকে মুখ করে
সেজদা দিয়ে পড়ে আছে। ভিড় ঠেলে বারান্দায় গিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে খাজা
মঈনুদ্দিন চিশতীর উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম, নিজের জন্য আল্লাহর কাছে
প্রার্থণা করলাম। দোয়া শেষে কিছুক্ষণ ভেতরে অবস্থান করলাম। ধর্ম, জাতি, বর্ণ
নির্বিশেষে মানুষের সমাগম দেখে মনে হলো—মানুষের অন্তরের আকাঙ্ক্ষা আর শ্রদ্ধা
সবখানে এক।
আজমীর শরীফে দরগার পাশে এক দেয়ালে দেখলাম সেখানে একটি স্তম্ভে সুতা বাঁধার হিরিক। কেনো কি উদ্দেশ্যে সেই সূতা বাঁধে তা বোধগম্য হলো না। তবে একজন বললো, কেউ কিছু কামনা করে সূতা বাঁধলে নাকি তার সেই মনবাসনা পূর্ণ হয়।
সেখানে ঢাকার এক নামকরা শিল্পপতির নামে (নামটা এখন আর মনে নাই) একগুচ্ছ সুতা বাঁধা দেখলাম। সুতা বাঁধতেও টাকা লাগে। যে যতো বেশি টাকা দিয়ে সুতা বাঁধতে পারে তারটাই মনেহয় ওভাবে স্মরণীয় করে রাখা হয়।
একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম। এতোদিন কেউ আজমীর থেকে ঘুরে এসে একটু করে
তবারক বিতরণ করতো, বলতো “তবারক খেলে সওয়াব হবে”। আজমীরে গিয়ে দেখলাম, মাজারের
বাইরে অসংখ্য তবারকের দোকান, যেভাবে কোনো উপলক্ষে মেলা বসে- সেখান থেকে সবাই তবারক
কিনে নিয়ে যায়। মাজারের ব্যবস্থাপনায় কোনো তবারক বিতরণ করা হয় না।
তবে দরগার পাশে আশ্চর্য রকমের বিশালাকার এক ডেগচিতে দেখলাম কি যেন
রান্না করছে, সম্ভবত মাংশ-খিচুরি। তাতে মশলা দিচ্ছে বেলচা দিয়ে যেভাবে মাটি কাটে
সেভাবে। অতবড় ডেগচি পৃথিবীর আর কোথাও আছে কিনা সন্দেহ আছে।
সকালে জার্নি, বিকেলে দরগায় ঘোরাঘুরি করে ক্লান্ত দেহে ফিরে গেলাম
হোটেলে। পরের দিনের প্রোগ্রাম- খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির অলৌকিক পানি প্রাপ্তির স্থান
‘আনার সাগর’ দেখতে যাওয়া।
আনা সাগর পরিদর্শনর
ভারতের রাজস্থান রাজ্যের আজমীর শহরে অবস্থিত একটি কৃত্রিম হ্রদ, যা
১১৩৫-১১৫০ খ্রিস্টাব্দে পৃথ্বীরাজ চৌহানের পিতামহ অর্ণরাজা, যিনি আনা নামেও পরিচিত,
তিনি প্রজাদের পানির চাহিদা মেটাতে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করেন। তাঁর নামেই এর নামকরণ
করা হয় “আনা সাগর”। লুনী নদীর উপর বাঁধ দিয়ে এই হ্রদটি তৈরি করা হয়, যা আজমীর
শহরের একটি অন্যতম জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান।
| আনা সাগর। ছবিঃ গুগল থেকে |
আনা সাগর সম্পর্কে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীর উপাখ্যান
আনা সাগর সম্পর্কিত খাজা মইনুদ্দিন চিশতীর এক অলৌকিক ঘটনা্র একটি
উপাখ্যান প্রচলিত আছে। রাজা পৃথ্বীরাজের রাজত্বকালে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী, যিনি ‘খাজা
গরীবে নেওয়াজ’ নামেও পরিচিত- ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আজমীরে আগমন করেন এবং
আনা সাগরের তীরে বসতি স্থাপন করেন। খাজার আগমনে স্থানীয় পুরোহিতরা প্রাথমিক
পর্যায়ে তাঁর বিরোধিতা করেন।
কথিত আছে, একদিন খাজার একজন
অনুসারী আনা সাগরে অজু করতে গেলে পুরোহিতরা তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। অপমানিত
অনুসারীর কাছ থেকে ঘটনা শুনে খাজা মইনুদ্দিন চিশতী তাঁর শিষ্য মোহাম্মদ সাদীকে আনা
সাগরের সমস্ত পানি একটি মাত্র ঘটিতে ভরে আনতে নির্দেশ দেন। নির্দেশ
অনুযায়ী মোহাম্মদ সাদী পানি নিয়ে এলে আনা সাগর শুকিয়ে যায়। অতঃপর পুরোহিতদের
অনুরোধে মোহাম্মদ সাদীর হাতে পানি আনা সাগরে ঢেলে দিলে এক ঘটি পানিতে মুহূর্তেই
বিশাল হ্রদটি ভরে যায়।
| আনা সাগর। ছবিঃ গুগল থেকে |
আরেকটি উপাখ্যান আছে, ‘রাজা
পৃথ্বীরাজের লোকজন হযরত খাজা বাবা (র.আ.) এবং তাঁর অনুসারীদের অপসারণের দাবি করেন এবং
অহংকার করে আজমিরের মাটি খালি করার জন্য চাপ দেন। আজমির ছেড়ে যাওয়ার এই নির্দেশটি
অত্যন্ত অশালীন এবং অনুচিতভাবে জারি করা হয়েছিলো। কিন্তু তিনি সেখানে থেকে কোনো
অবস্থাতেই মহান হযরত খাজা বাবা (রা.) তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে আজমীর ছেড়ে যেতে রাজি
হননি।
আনা সাগরের পাশে অনেক
মন্দির ছিলো। মন্দিরের সমস্ত পুরোহিত খাজা বাবা (রা.)-কে হত্যা করার চূড়ান্ত
লক্ষ্য নিয়ে তাঁকে আক্রমণ করে। তখন হযরত খাজা বাবা (রা.) নিজ হাতে কিছু ধুলো
নিয়ে ব্রাহ্মণদের উপর ছুঁড়ে মারেন। ফলে তারা পিছু হটে যান এবং তাদের কেউ কেউ
জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, কেউ কেউ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন এবং কেউ কেউ ভয়ে পালিয়ে
যান।
এই অলৌকিক ঘটনার পর বহু
মানুষ খাজা মঈনুদ্দিন চিশটি(রঃ)’র হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
আজমীরের ‘আনা সাগর’ এক নৈসর্গিক পরিবেশ। স্থির স্বচ্ছ নীল জলরাশি
দেখে মন ভরে যায়। লেকের চারপাশে বাহারি ফুলের বিন্যাস, ওয়াকওয়ে ও বসার বেঞ্চগুলো
যেন দু’হাতে ডাকছে পর্যটকদের। পানিতে নানা প্রজাতির মাছের জলকেলি ও মুক্ত হাঁসের
অবাধ বিচরণ হৃদয়ে দোলা দেয়, চোখ জুড়ায়। মাছের খেলা দেখে চোখ সরানো যায় না। কিছু
মানুষ মাছকে আগ্রহভরে খাবার দেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর মতো অত্যান্ত মনোরম
জায়গা আনা সাগর।
| আনা সাগরের পারে পর্যটকদের বিশ্রামের স্থান |
আমরা একটি ইঞ্জিনের নৌকায় লেকের অপরপাশে বেড়াতে গেলাম। যাওয়ার সময়
লেকের মাঝখানে অবস্থিত একটি দ্বীপে কিছুক্ষণ
অবস্থান করলাম। অতঃপর ওপারে গিয়ে সেখানকার পরিবেশ অবলোকন করে সেই টলারেই ফিরে
এলাম।
আনা সাগরের পাশেই (সম্ভবত
অপরপ্রান্তে) একটি মসজিদ আছে যার নাম “আড়াই দিন কা ঝোপড়া”। এটি একটি ঐতিহাসিক
মসজিদ যা আড়াই দিনে নির্মিত হয়েছলো বলে কথিত আছে এবং সেজন্যেই নাকি তার নাম “আড়াই
দিন কা ঝোপড়া”।
আনা সাগর দেখে পূনরায়
দরগায় অর্থাৎ আজমীর শরীফ কিছুক্ষণ অবলোকন করে ও কিছু তবারক কিনে সন্ধ্যার দিকে হোটেলে
প্রত্যাবর্তন। পরেরদিন বাসযোগে রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর যাওয়ার প্ল্যান। (চলবে……)









Leave a Reply