বাংলাদেশ আজ এক জটিল ও সূক্ষ্ম রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং বিতর্কিতভাবে ক্ষমতায় আসা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন অস্থায়ী সরকার। ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—দেশের সার্বভৌম কাঠামো ও সেনাবাহিনীর ঐক্যকে ভেঙে দেওয়ার এক সংগঠিত চক্রান্ত চলছে।
ইউনুসের অস্থায়ী সরকার: আইন ও সংবিধানের বাইরে একটি ক্ষমতা দখল
অধ্যাপক ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসন সংবিধানসম্মত নয়—এটি গঠিত হয়েছে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে। রাষ্ট্রপতি বা সংসদের অনুমোদন ছাড়াই, কোনো সাংবিধানিক ধারার ভিত্তি ছাড়াই, তিনি ক্ষমতা দখল করে “অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান” হিসেবে নিযুক্ত করেন-যদিও তিনি দাবি করেন, আন্দোলনকারী ছাত্ররা তার নিয়োগকর্তা।
এই প্রক্রিয়াটি ছিল মূলত এক প্রকার “soft coup”, যেখানে আন্তর্জাতিক মহলের কূটনৈতিক চাপ এবং দেশীয় একটি বেসামরিক-সামরিক লবির সম্মিলিত পরিকল্পনা কাজ করেছে।
ফলে এই সরকারকে এখন জনগণের সরকার বলা যায় না, বরং এটি একটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবিত প্রশাসনিক প্রকল্প, যার মূল উদ্দেশ্য—বাংলাদেশের সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণে আনা।
সেনাবাহিনীর ভেতর বিভাজন সৃষ্টি: জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত
অতীতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে—বিশেষত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সন্ত্রাস দমন ও শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। কিন্তু বর্তমান অস্থায়ী সরকারের সময়ে এই বাহিনীর ভেতর কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করা হয়েছে।
ইউনুস প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ কিছু আমলা ও আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে “দলীয় আনুগত্যভিত্তিক গ্রুপিং” গড়ে তুলেছে, যার ফলে পেশাদার অফিসারদের মনোবল ও ঐক্য হুমকির মুখে পড়েছে।
এর মাধ্যমে মূলত সেনাপ্রধানকে একা ও কোণঠাসা করা হচ্ছে—যেন তাকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে দায়ী করে একটি দুর্বল অবস্থানে রাখা যায় কিংবা অপসারণ করা যায়। ইতোপূর্বেও সেনা প্রধানকে অপসারণের প্রচেষ্টা করা হয়েছে।
জঙ্গি দমন ব্যর্থতার দায়: রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিকৃতি
বর্তমান সংকটের সূচনা হয়েছিল জঙ্গিবাদ দমনে দুর্বলতা থেকে।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দক্ষিণাঞ্চল ও সীমান্ত এলাকায় ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে সংগঠিত হতে শুরু করে।
আইনানুগ পদ্ধতিতে দমন করা সম্ভব ছিল—কিন্তু রাজনৈতিক প্ররোচনায় সেই পরিস্থিতিকে “জনবিপ্লব” বলে আখ্যা দেওয়া হয়। ফলে প্রশাসন ও সেনা নেতৃত্বের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে সহজ করে দেয়।
এখানে প্রশ্ন ওঠে—এটি কি শুধুই প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘটিত একটি নিরাপত্তা নাশকতা, যার উদ্দেশ্য ছিল সরকার পতনের পথ প্রশস্ত করা?
সামরিক অফিসারদের বিচার: সংবিধানবিরোধী উদ্যোগ
সম্প্রতি International Crimes Tribunal (ICT) সংশোধন করে কিছু চাকরিরত উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে বেসামরিক আদালতে বিচার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এটি সম্পূর্ণভাবে সংবিধানবিরোধী।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সংবিধান ও সামরিক আইন দ্বারা পরিচালিত হয়, যেখানে চাকরিরত অফিসারদের বেসামরিক আদালতে বিচার করা যাবে না, যতক্ষণ না তারা আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি বা সেনাপ্রধানের অনুমোদনে সামরিক আদালত থেকে বেসামরিক আদালতে সোপর্দ হন।
এই আইন সংশোধনের মাধ্যমে ইউনুস প্রশাসন আসলে সেনাবাহিনীকে আইনগতভাবে দুর্বল ও আত্মরক্ষাহীন অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে।
এটি সামরিক ন্যায্যতা নয়—এটি একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, যা সেনাবাহিনীর মর্যাদাকে ভাঙার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
দেশি–বিদেশি চক্রান্ত: বাংলাদেশকে দুর্বল করার দীর্ঘমেয়াদি নকশা
বাংলাদেশ এখন বহুমাত্রিক চাপের মধ্যে রয়েছে—
- পশ্চিমা কূটনীতিকদের মানবাধিকার অজুহাতে হস্তক্ষেপ,
- সীমান্তে মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা,
- ভারতের ভূরাজনৈতিক প্রভাব,
- এবং দেশীয় কিছু বেসরকারি সংগঠনের মাধ্যমে তথ্য-যুদ্ধ।
এই বহুমুখী চাপে বাংলাদেশের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সেনাবাহিনীকে বিতর্কে জড়িয়ে দিয়ে, তাকে রাজনৈতিক খেলায় টেনে এনে, দেশের মেরুদণ্ডকে নরম করার একটি সংগঠিত কৌশল চলছে।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকট শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক ক্ষমতা-বিন্যাস নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের লড়াই।
অধ্যাপক ইউনুসের অস্থায়ী সরকার যে পথে হাঁটছে, তা দেশীয় আইন, সেনা কাঠামো এবং সার্বভৌম মর্যাদার পরিপন্থী।
সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বর্তমানে এমন এক অবস্থায় আছেন যেখানে তাঁকে একই সঙ্গে বাহিনীর সম্মান, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং সংবিধানের রক্ষা—এই তিনটি ভারসাম্যের মধ্যে চলতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই ভারসাম্য কতটা ধরে রাখা যায় এবং সেনাবাহিনী কতটা ঐক্যবদ্ধ থেকে জাতির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে তার উপর।








Leave a Reply