বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়—বরং কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের গম আমদানির প্রধান উৎস ছিল রাশিয়া, ইউক্রেন ও ভারত। এবার যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্ত করা নতুন কূটনৈতিক ইঙ্গিত বহন করছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক?
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও আমেরিকান গমের অবস্থান
বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম প্রধান গম রপ্তানিকারক দেশ। তাদের গমের মান উন্নত, প্রোটিন বেশি এবং সংরক্ষণযোগ্যতা তুলনামূলক দীর্ঘ।
বর্তমানে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগর অঞ্চল থেকে গম সরবরাহে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ভারতও নিজ দেশের খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভেবে রপ্তানি সীমিত করেছে। ফলে ঝুঁকি কমানোর একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি ।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ: দাম বনাম গুণগত মান
- দাম: আমেরিকান গম রাশিয়া বা ইউক্রেনের তুলনায় প্রতি টন প্রায় ২০–৩০ ডলার বেশি দামে বিক্রি হয়।
- গুণগত মান: এতে প্রোটিনের পরিমাণ ১১–১৩% পর্যন্ত, যা রুটি, বিস্কুট ও নুডলস তৈরিতে আদর্শ।
- লাভ: উন্নত মানের কাঁচামাল পেলে খাদ্যশিল্পের মানও বাড়বে—দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়বে আন্তর্জাতিক বাজারে।
অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে ব্যয়বহুল হলেও দীর্ঘমেয়াদে উপকারিতা বেশি।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ: সম্পর্ক পুনর্গঠনের বার্তা
নির্বাচন, মানবাধিকার ও নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ–মার্কিন সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল।
এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি একধরনের ইকোনমিক কূটনীতি (economic diplomacy) হিসেবে দেখা যায়।
এর মাধ্যমে ঢাকা ওয়াশিংটনকে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে—“আমরা এখনো বাণিজ্য ও সহযোগিতায় আগ্রহী।”
এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে GSP সুবিধা, বিনিয়োগ চুক্তি, কিংবা অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হতে পারে।
সরবরাহ নিরাপত্তা ও খাদ্য মজুত নীতি
বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬০–৭০ লাখ টন গম আমদানি করে, যার বড় অংশ আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে।
যুদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার মতো অনিশ্চয়তা একক উৎসের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন উৎস হিসেবে যুক্ত করা মানে হলো সরবরাহ বহুমুখীকরণ (diversification)—যা ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
- পরিবহন খরচ: দূরত্বের কারণে পরিবহন ব্যয় তুলনামূলক বেশি।
- ডলার সংকট: বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যয় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
- বাণিজ্য ভারসাম্য: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির তুলনায় আমদানি করে বেশি—ফলে ঘাটতি আরো বাড়তে পারে।
সার্বিক বিশ্লেষণ
সবদিক বিবেচনা করলে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক এবং দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ।
এটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, সরবরাহ বৈচিত্র্য আনবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি বাস্তব বার্তা বহন করবে। তবে আমদানি ব্য্যবহুল হওয়ায় এটা ধরে রাখা যাবে কিনা তা ভবিষ্যতই নির্ধারণ করবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি ব্যালান্সড ট্রেড নীতি—যেখানে একদিকে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত থাকবে, অন্যদিকে কূটনৈতিক সম্পর্কও ভারসাম্যে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি সেই ভারসাম্যের একটি কার্যকর পদক্ষেপ।
সঠিক দরপত্র, মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছ আমদানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এটি বাংলাদেশের খাদ্য নীতিতে একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। তবে দাম যদি বর্তমান বাজার দর থেকে বেশি হয় সেটা ভোক্তা জনসাধারণের কাছে কতটা সহনীয় হবে সেটাও মাথায় রাখতে হবে। অন্যদিকে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশের পন্যের উপর যে কর নির্ধারণ করা হয়েছে সেটাও পূনর্বিবেচনার দবি রাখে।








Leave a Reply