ইস্কান্দার মির্জা থেকে মোশাররফ—এবং আজকের অসীম মুনির: দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিপদের বিশ্লেষণ
পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই দেশটি অসংগত রাজনৈতিক কাঠামো, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় অদক্ষতার কারণে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নেয় সেনাবাহিনী—যারা নিজেদেরকে রাষ্ট্রের অভিভাবক, রক্ষক এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে পাকিস্তানের মতো স্থায়ীভাবেই “সামরিক শাসিত রাষ্ট্র” আর কোথাও গড়ে ওঠেনি।
এই দীর্ঘ সামরিক রাজনৈতিক ধারাটি বোঝার জন্য ইতিহাসের পাঁচটি বড় অধ্যায়—ইস্কান্দার মির্জা, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়া-উল-হক এবং পারভেজ মোশাররফ—খুব স্পষ্ট একটি প্যাটার্ন দেখায়। আর সেই প্যাটার্নই আজ সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনিরের আচরণে আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রবন্ধে সেই পুরো ধারাটির বিস্তৃত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রগঠন ও সামরিক আধিপত্যের শেকড়
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভিত্তি শুরু থেকেই দুর্বল ছিল।
- একটি ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র
- দুটি ভাষা, দুটি সংস্কৃতি, দুটি অর্থনীতি
- কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অদক্ষতা
- এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সিভিল-সামরিক ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর সংখ্যাগত ও সাংগঠনিক শক্তি
রাষ্ট্রগঠনের সময় থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারতবিরোধী নিরাপত্তা-মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে নিজেদেরকে রাষ্ট্রের “কেন্দ্রীয় স্তম্ভ” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
১৯৫১ সালের লিয়াকত আলী খানের হত্যার পর রাজনৈতিক নেতৃত্ব পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই শূন্যস্থান পূরণ করে সিভিল-সামরিক এলিটরা—বিশেষত আমলাতন্ত্র (বুরোক্রেসি) এবং সেনাবাহিনী।
ইস্কান্দার মির্জা: সামরিক কর্তৃত্বের জন্মদাতা
ইস্কান্দার মির্জা ছিলেন একজন সামরিক কর্মকর্তা থেকে সিভিলিয়ান রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত অভিজ্ঞ আমলা। কিন্তু তার প্রধান ভুল—রাজনীতিকে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা।
তার শাসনকালকে ঘিরে চারটি বড় বৈশিষ্ট্য:
- গণতন্ত্রকে অবিশ্বাস – নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি অবিশ্বাস তাকে ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল করে তোলে।
- রাজনৈতিক দল ভাঙা ও তৈরি করা – মির্জা ক্ষমতা ধরে রাখতে লিগ, রিপাবলিকান পার্টি, শিল্পপতি গোষ্ঠী—সবাইকে নিজের মতো ব্যবহার করেন।
- মার্শাল ল’-এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ – সামরিক হস্তক্ষেপকে বৈধ করতে আইনি কাঠামো তৈরির ভিত্তি স্থাপন করেন তিনি।
- আইয়ুব খানের ক্ষমতায় ওঠার পথ তৈরি – সেনাপ্রধানকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া মির্জার পতনের প্রধান কারণ।
১৯৫৮ সালে যখন আইয়ুব খান অভ্যুত্থান ঘটান, তখনই পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী স্থায়ীভাবে ‘শাসকশ্রেণী’ হয়ে ওঠে।
আইয়ুব খান: উন্নয়নের আড়ালে সামরিক-অর্থনৈতিক অভিজাততন্ত্র
আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রথম বাস্তব সেনাশাসক। পশ্চিমা দাতাদের চোখে তিনি ছিলেন “মডার্নাইজার”, কিন্তু বাস্তবে তিনি ছিলেন সামরিক-অর্থনৈতিক এলিটদের রক্ষক।
তার সময়কার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য:
- “ডিসিপ্লিনড ডেমোক্রেসি” নামে সামরিক শাসনকে ন্যায্যতা দেওয়া
- গ্রিন রেভলিউশন, শিল্পায়ন—যার অধিকাংশ লাভ পশ্চিম পাকিস্তানে
- “এক ইউনিট” নীতি, যার লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক শক্তিকে ছত্রভঙ্গ করা
- ফাতিমা জিন্নাহকে পরাজিত করতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার
পূর্ব পাকিস্তানে বৈষম্যের গভীর তলানি
- বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৭০% এলোও নিষ্পেষণ বাঙালিদের ওপর
- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পে অত্যন্ত কম বিনিয়োগ
- রাষ্ট্রীয় চাকরিতে পূর্ব পাকিস্তানকে কোণঠাসা করা
এই বৈষম্যের ওপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলন জন্ম নেয়।
ইয়াহিয়া খান: রাষ্ট্রীয় ভাঙন ও ১৯৭১—পাকিস্তানের সর্বনাশের মুখ
ইয়াহিয়া খান আইয়ুবের তুলনায় আরও অযোগ্য ও আত্মবিনাশী চরিত্র।
তিনি একদিকে মাতলামি, নারীসঙ্গ ও বিলাসিতায় ডুবে থাকতেন; অন্যদিকে রাজনৈতিক কৌশলগত ভুলে দেশকে ধ্বংস করে দেন।
তার সবচেয়ে বড় ভুলগুলো:
- ১৯৭০ নির্বাচনের ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি
- সংলাপ ভেঙে ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু করা
- মুক্তিযুদ্ধকে সামরিকভাবে দমন করার দুর্বুদ্ধি
- মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বশক্তির দৃষ্টিভঙ্গি ভুল বোঝা
ইয়াহিয়ার শাসনের পরিণতি ছিল অবশ্যম্ভাবী:
পাকিস্তানের ভাঙন এবং বাংলাদেশের জন্ম।
ইতিহাসে ইয়াহিয়া খানকে গণহত্যাকারী স্বৈরশাসক হিসেবে স্মরণ করা হয়।
জেনারেল জিয়া-উল-হক: পাকিস্তানের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্বৈরশাসন
জিয়া-উল-হক পাকিস্তানের সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব রেখে যান—যা আজও দেশটিকে তাড়া করে বেড়ায়।
জিয়ার ‘ইসলামাইজেশন’ প্রকল্প:
- শরিয়াহ আইন নাম দিয়ে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়া
- তালেবান ও জিহাদি কাঠামোর বীজ বপন
- জঙ্গিবাদকে রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ করা
- আফগান যুদ্ধে যুক্ত হয়ে আইএসআইকে অপ্রতিরোধ্য করা
জিয়ার সময়েই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি—সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে।
জিয়ার নির্মাণ করা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা পরবর্তীতে পাকিস্তানকে আরও অস্থিতিশীল করে।
পারভেজ মোশাররফ: আধুনিকতার মুখোশ এবং পুরনো সামরিক মানসিকতা
মোশাররফ নিজেকে আধুনিক, সুশীল স্বৈরশাসক হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
- স্বাধীন বিচারব্যবস্থা দমন
- গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ
- বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরিফকে প্রতিহত করা
- আইএসআইকে রাজনীতিতে ব্যবহার
২০০৮ সালে গণআন্দোলনের মুখে তিনি ক্ষমতা হারান।
পাকিস্তানের সামরিক-রাজনৈতিক কাঠামোর স্থায়ী বৈশিষ্ট্য
পাকিস্তানের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে যে ৫টি ধারা প্রতিনিয়ত দেখা যায়—
- গণতন্ত্রকে দুর্বল রেখে সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী রাখাঃ রাজনৈতিক দলগুলোকে বিভক্ত ও দুর্বল করা—স্থায়ী নীতি।
- কৌশলী আমলাতন্ত্র ও সেনাবাহিনীর জোটঃ বুরোক্রেটিক এলিট সবসময় সেনাবাহিনীর অংশীদার।
- যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও চীনের সহায়তাঃ সামরিক শাসনকে টিকিয়ে রাখার প্রধান আন্তর্জাতিক উৎস।
- অর্থনীতিতে মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সঃ ফৌজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (Fauji Foundation), DHA, সেনাবাহিনীর জমি—সবই মিলিয়ে সামরিক অর্থনীতি।
- আইএসআইকে রাষ্ট্রের ‘ছায়া সরকার’ হিসেবে গঠনঃ সিভিল সরকার কেবল নামমাত্র; বাস্তব ক্ষমতা সামরিক-গোয়েন্দা বাহিনীর।
এই সবগুলো আজও পাকিস্তানের সমস্যার উৎস।
বর্তমান সেনাপ্রধান অসীম মুনির: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
অসীম মুনির আজ পাকিস্তানের বাস্তব শাসক। প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতি কেউই তার সমকক্ষ নয়।
তার বর্তমান কার্যক্রম—
- ইমরান খানকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করা
- নওয়াজ-শাহবাজ সরকারের ওপর ছায়া সরকার হিসেবে কর্তৃত্ব
- বিচারব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ
- রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি
- মিডিয়াকে ভীত-নিশ্চুপ রাখা
- সামরিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনসমর্থন দমন
ইমরান খানকে নতজানু করতে গিয়ে অসীম মুনির অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছেন—যা ঐতিহাসিকভাবে সামরিক শাসকদের পতনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অসীম মুনিরের সম্ভাব্য পরিণতি: ইতিহাস যা বলে
ইতিহাসের আলোকে তিনটি দৃশ্যপট সবচেয়ে সম্ভাব্য—
দৃশ্যপট–১: জোরপূর্বক অপসারণ
যেমনটা হয়েছিল আইয়ুব, ইয়াহিয়া, জেনারেল ওয়াহিদ, এবং মোশাররফের ক্ষেত্রে।
সেনাবাহিনীর ভেতরেই তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে।
ইমরান খানের প্রতি জনসমর্থনের ঢেউয়ে সেনাবাহিনীর নিচের ও মাঝারি স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
এ ধরনের অস্বস্তিকর অবস্থায় জেনারেলদের পতন খুব দ্রুত ঘটে।
দৃশ্যপট–২: সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভাঙন ও ফাটল
ইমরানপন্থী ও এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট ব্লকের উত্থান পাকিস্তানের ইতিহাসে নতুন।
এ বিভাজন ভবিষ্যতে অভ্যুত্থান বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের দিকে যেতে পারে।
দৃশ্যপট–৩: পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে—
- বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে
- রিজার্ভ সংকট
- রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
- প্রদেশভিত্তিক বিদ্রোহ
এই পরিস্থিতিতে সামরিক আধিপত্য ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে এর প্রভাব
- পাকিস্তানের অস্থিতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিরতা বাড়ায়।
বিশেষত জিহাদি নেটওয়ার্কের কারণে।
- ভারত-পাক উত্তেজনা ঘনীভূত হলে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক চাপ বাড়ে।
- পাকিস্তানের সামরিক মানসিকতা পার্শ্ববর্তী দেশে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদকে পরোক্ষভাবে শক্তিশালী করে।
- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার পাকিস্তানি প্রচারণা অব্যাহত থাকে।
অসীম মুনিরের শাসনে আইএসআই আরও সক্রিয় হয়েছে।
উপসংহার: পাকিস্তান কি কখনো সামরিক রাজনীতির বাইরে আসবে?
পাকিস্তানের সামরিক-রাজনৈতিক ইতিহাস প্রমাণ করে,
সামরিক শাসন একদিকে রাষ্ট্রকে দুর্বল করে, অন্যদিকে সেনাবাহিনীকে স্বৈরশাসক মনোভাবের দিকে ঠেলে দেয়।
ইস্কান্দার মির্জার বপন করা বীজ
আইয়ুবের যান্ত্রিক শাসন,
ইয়াহিয়ার গণহত্যা,
জিয়ার জঙ্গিবাদ,
মোশাররফের আধুনিকতার মুখোশ—
সব মিলে পাকিস্তানকে একটি চির-অস্থিতিশীল, অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল, বাহ্যিকভাবে আক্রমণাত্মক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
অসীম মুনিরও সেই একই ভুল পথে হাঁটছেন।
ইতিহাসের যে চক্র—
সামরিক আধিপত্য → জনঅসন্তোষ → অভ্যন্তরীণ বিভাজন → আকস্মিক পতন
—এটি তার ক্ষেত্রেও ঘটার সম্ভাবনা খুব বেশি।








Leave a Reply