আসলে কি ৫২টি বাজার, নাকি বাজার-নামযুক্ত ৫২টি স্থানের নাম?
বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ—“ঢাকায় ৫২ বাজার ৫৩ গলি।” শত শত বছর ধরে এই কথাটি মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ কী? সত্যিই কি একসময় ঢাকায় ৫২টি বাজার ও ৫৩টি গলি ছিলো, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় পুরান ঢাকার ইতিহাসে।
প্রবাদের উৎপত্তি
মুঘল আমলে, বিশেষ করে ১৬০৮ সালে ইসলাম খাঁ বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করার পর শহরটি দ্রুত একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। বুড়িগঙ্গা নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠে অসংখ্য মহল্লা, কারিগরপাড়া, ব্যবসাকেন্দ্র এবং আবাসিক এলাকা। দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ীরা এখানে আসতেন। মসলিন, রেশম, মসলা, ধাতব সামগ্রী ও নানা হস্তশিল্পের জন্য ঢাকা বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।
এই ব্যস্ত নগরজীবন থেকেই সম্ভবত জন্ম নিয়েছিল—”ঢাকায় ৫২ বাজার ৫৩ গলি” প্রবাদটি।
সত্যিই কি ছিল ৫২টি বাজার?
লোকমুখে প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, মুঘল আমলে ঢাকায় ৫২টি বাজার এবং ৫৩টি উল্লেখযোগ্য গলি ছিলো। কিন্তু ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল, গেজেটিয়ার কিংবা পুরোনো নথিপত্রে এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি, যেখানে নিশ্চিতভাবে সেই ৫২টি বাজার ও ৫৩টি গলির নাম উল্লেখ রয়েছে।
তাই ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন, সংখ্যা দুটি হয়তো প্রতীকী—অর্থাৎ “অনেক বাজার, অনেক গলি” বোঝানোর একটি লোকপ্রবাদ।
জায়গার নামের সাথে “বাজার” থাকায় কি এটা বোঝানো হয়েছে?
আরেকটি ব্যাখ্যা রয়েছে, যা অনেকের কাছে বেশ যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়।
পুরান ঢাকার দিকে তাকালেই দেখা যায়, অসংখ্য এলাকার নামের সঙ্গেই “বাজার” শব্দটি জড়িয়ে আছে। যেমন—
- চকবাজার
- বাংলাবাজার
- শাঁখারীবাজার
- ঠাটারীবাজার
- লক্ষ্মীবাজার
- বেগমবাজার
- বাবুবাজার
- বকশীবাজার
- আলুবাজার
- নবাববাজার
- নাজিরাবাজার
- কাপ্তানবাজার
- মগবাজার
- কারওয়ান বাজার
ইত্যাদি।
এগুলো কেবল কেনাবেচার স্থান ছিলো না; সময়ের সঙ্গে এগুলো স্বতন্ত্র মহল্লা, বাণিজ্যকেন্দ্র এবং নগর-পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। তাই একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—প্রবাদের “৫২ বাজার” কি আসলে এ ধরনের বাজার-নামযুক্ত এলাকাগুলোকেই বোঝায়?
“৫৩ গলি”র ক্ষেত্রেও কি একই ব্যাখ্যা?
একই ধরনের যুক্তি “গলি” শব্দটির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।
পুরান ঢাকায় এবং পুরোনো ঢাকার আশপাশে এমন অনেক পথ, মহল্লা বা এলাকার পরিচিতি ছিল “গলি” বা লেন(Lane) নামে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো ভূতের গলি।
এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তি, পেশা বা স্থানীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আরও অনেক গলির নাম প্রচলিত ছিলো, যাদের অনেকগুলোর নাম আজ পরিবর্তিত হয়েছে বা হারিয়ে গেছে।
আবার ইংরেজিতে ‘লেন’ সংযুক্ত আছে এমন অনেক গলি আছে পুরান ঢাকায়, যেমন; আগা মসিহ লেন, শ্রীশদাস লেন, প্যেয়ারীদাস লেন, কে এম দাস লেন, জাস্টিস লাল মোহন দাস লেন – এমন আরো অনেক।
তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—“৫৩ গলি” কি নির্দিষ্ট ৫৩টি সরু রাস্তা বোঝায়, নাকি “গলি” বা লেন নামযুক্ত এলাকাগুলোর সমষ্টিগত পরিচয়?
নামের মধ্যেই ইতিহাস
পুরান ঢাকার স্থানের নামগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অধিকাংশ নামের পেছনেই রয়েছে কোনো পেশা, সম্প্রদায়, ব্যক্তি বা ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি।
- শাঁখারীবাজারের নাম এসেছে শঙ্খশিল্পীদের বসতি থেকে
- ঠাটারীবাজারের নাম এসেছে ঠাটারি বা ধাতুশিল্পীদের থেকে
- তাঁতীবাজারের নাম তাঁতিদের পেশার স্মৃতি বহন করে
- বকশীবাজারের সঙ্গে মুঘল প্রশাসনের “বখশী” পদবির সম্পর্কের কথা বলা হয়
- কারওয়ান বাজারের নাম এসেছে কাফেলা বা “কারভান”-ভিত্তিক বাণিজ্যের স্মৃতি থেকে।
অর্থাৎ “বাজার” শব্দটি অনেক ক্ষেত্রেই কেবল বাজার নয়; একটি এলাকার পরিচয়ও বহন করছে।
তাহলে কোন ব্যাখ্যাটি বেশি গ্রহণযোগ্য?
বর্তমানে যে তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়, তাতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে ঢাকায় ঠিক ৫২টি বাজার এবং ৫৩টি গলি ছিলো। কারণ এমন কোনো নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তালিকা ইতিহাসে সংরক্ষিত নেই।
অন্যদিকে, ঢাকার অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থানের নামের শেষে “বাজার” এবং “গলি” শব্দের উপস্থিতি এই ধারণাকে শক্তিশালী করে যে, প্রবাদটি হয়তো বাজার-নামযুক্ত ও গলি-নামযুক্ত এলাকাগুলোর সমষ্টিগত পরিচয় থেকেই এসেছে।
অবশ্য এটিও এখনো একটি গবেষণাযোগ্য ব্যাখ্যা। নতুন কোনো নথি বা দলিল আবিষ্কৃত হলে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সময় বদলেছে, প্রবাদ রয়ে গেছে
আজকের ঢাকা আর মুঘল আমলের ছোট্ট নগর নয়। এখন এখানে শত শত বাজার, হাজারো রাস্তা ও অগণিত অলিগলি রয়েছে। অনেক পুরোনো নাম হারিয়ে গেছে, আবার অনেক নাম টিকে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।
কিন্তু “ঢাকায় ৫২ বাজার ৫৩ গলি” প্রবাদটি এখনো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই শহরের ইতিহাস কেবল রাজপ্রাসাদ বা শাসকদের ইতিহাস নয়; এটি ব্যবসায়ী, কারিগর, নৌপথ, মহল্লা, বাজার আর অলিগলির ইতিহাসও।
উপসংহার
“ঢাকায় ৫২ বাজার ৫৩ গলি”—এই প্রবাদের প্রকৃত অর্থ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: এটি পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক পরিচয়ের প্রতীক।
একদিকে লোকপ্রচলিত ধারণা বলছে, এটি বাজার ও গলির সংখ্যা নির্দেশ করে। অন্যদিকে স্থানের নাম বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, “বাজার” ও “গলি” শব্দদুটি হয়তো কিছুসংখ্যক বাজার-নামযুক্ত ও গলি-নামযুক্ত এলাকাকেই ইঙ্গিত করে। বর্তমানে কোনো মতের পক্ষেই শতভাগ প্রামাণ্য তালিকা নেই। তাই এই প্রবাদকে ইতিহাসের একটি আকর্ষণীয় ধাঁধা বললেও অত্যুক্তি হবে না।
হয়তো ভবিষ্যতে নতুন কোনো নথি বা গবেষণা এই রহস্যের আরও স্পষ্ট উত্তর দেবে। ততোদিন পর্যন্ত “ঢাকায় ৫২ বাজার ৫৩ গলি” শুধু একটি প্রবাদ নয়, বরং পুরান ঢাকার চার শতাধিক বছরের ঐতিহ্য, স্মৃতি ও নগর-সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে থাকবে।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী | ডালু সম্প্রদায়ঃ একই গোত্রে যাদের বিয়ে নিষিদ্ধ







Leave a Reply