কখনও কি ভেবেছেন, আপনি এখন যেখানে
দাঁড়িয়ে আছেন সেটি আসলে এক সময় কী ছিল?
পৃথিবীর শুরু থেকেই বাংলাদেশের ভূখণ্ড
এমন ছি্লো না। বাংলার এই ভূখণ্ডের কোনও অস্তিত্বই ছিলো না। রংপুর, সিলেটের এলাকা থেকে
দক্ষিণে যা দেখি তার সবটুকুই ছিলো সমুদ্রের পানির নিচে। আজকের খুলনা, যশোর, ঢাকা, চট্টগ্রামের
তখন কোনও চিহ্নই ছিল না। অথচ এসব এলাকা এখন বিষুবরেখার উত্তরে অবস্থিত হলেও তার জন্মের
ইতিহাস পুরোটাই রোমাঞ্চকর।
বঙ্গীয় ব-দ্বীপ শুরুতেই ছিলো পৃথিবীর
অপর প্রান্তে দক্ষিণ গোলার্ধে অ্যান্টার্কটিকার কাছে। তার মানে প্রায় ১৩ থেকে ১৭ কোটি
বছর আগে ১ লক্ষ ৪৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের বাংলাদেশের ভূখণ্ড ছিল অস্তিত্বহীন, কেবলই
সমুদ্র!
বাংলার এই শান্ত বিস্তীর্ণ সমতলভূমির
জন্মের পেছনে লুকিয়ে আছে মহাদেশটির পাতগুলোর ভয়ঙ্কর সংঘর্ষের ইতিহাস। আর একটি দুটি
নয়, আছে চার থেকে পাঁচটি ভূখণ্ড থেকে আসা পলিমাটি। বঙ্গীয় ব-দ্বীপ ছাড়াও আছে পৃথিবীর
সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়, কাঞ্চনজঙ্ঘা সহ আরও অনেকগুলো পর্বতমালা জেগে ওঠার গল্প।
তাই ১৮ কোটি বছরের যাত্রায় বিশাল এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস লুকিয়ে আছে এই পৃথিবীর বৃহত্তম
ব-দ্বীপ সৃষ্টির পেছনে যে রোমাঞ্চকর ইতিহাস তা নিয়ে এবারের পর্ব।
হিমালয় থেকে বাংলাদেশের জন্মের রোমাঞ্চকর যাত্রা
ভৌগোলিক সেই রহস্য জানার আগে অবশ্যই
আমাদের কিছু বিষয়ে জানতে হবে, তা হলো; এই ভূমিরূপের সৃষ্টি কিংবা আদি অবস্থা সম্পর্কে।
কীভাবে তা অনবরত বদলে গেছে, যাচ্ছে এবং সেই সাথে বদলে দিচ্ছে আমাদেরও প্রতিনিয়ত।
আমরা জানি আমাদের এই পুরো পৃথিবী কিছু
টেকটোনিক প্লেটের উপর অবস্থিত। আর এসব টেকটনিক প্লেট প্রতি নিয়ত চলমান। শুনতে অবাক
লাগলেও এটাই সত্য। অভ্যন্তরীণ ফুটন্ত লাভার স্রোতে আমাদের পৃথিবীর সমস্ত ভূমি, পাহাড়,
পর্বত, নদী, সমুদ্র সহ সকল দেশ, মহাদেশ ভেসে বেড়াচ্ছে। তবে খুব ধীরে ধীরে।
টেকটোনিক প্লেটের ভেসে বেড়ানোর বৈশিষ্ট্য
পৃথিবীর মানচিত্র পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলে। যেমন কোটি কোটি বছর আগে আমেরিকা মহাদেশ
ও আফ্রিকা মহাদেশ একত্রিত ছিল। ভূ-প্লেটের স্থানচ্যুতির কারণে এগুলো আলাদা হয়ে যায়।
শুধু কি আফ্রিকা, আমেরিকা? আজ থেকে
৫ কোটি বছর আগেও আমরা যাকে বঙ্গীয় ব-দ্বীপ বলে জানি, তার অস্তিত্বই ছিলো না। তাই ১৮
কোটি বছর আগে পৃথিবীতে কোনো আলাদা আলাদা মহাদেশও ছিলো না। সবগুলো মিলে একটি অতিমহাদেশ
ছিলো। সেই বিশাল ভূ-ভাগকে বলা হয় প্যানজিয়া। পরবর্তীতে সেটি ভেঙে তৈরি হয় লরেশিয়া
এবং গন্ডোয়াল্যান্ড। সেই সময় পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ম্যান্টল উথলে ওঠার ফলে গন্ডোয়াল্যান্ড-এর
টেকটোনিক প্লেটে ফাটল ধরে এবং ৪ খন্ডে বিভক্ত হয়ে তা আফ্রিকা, অ্যান্টার্কটিকা, অস্ট্রেলিয়া
এবং ইন্ডিয়ান টেকটনিক প্লেটে পরিণত হয়।
আমাদের টেকটনিক প্লেট মূলত ইন্দো-অস্ট্রেলিয়
টেকটোনিক প্লেটের অন্তর্ভুক্ত, যা মাদাগাস্কার থেকে বিভক্ত হয়েছিলো বলে ধারণা করা
হয়। আর এই গন্ডোয়াল্যান্ড থেকেই শুরু বাংলার এই ব-দ্বীপের যাত্রা।
এই ফাটলের চিরগুলো ধরে ধরে অগ্ন্যুৎপাতের
সাথে যে লাভা বা ম্যাগমা উঠে এসেছিলো, তার অস্তিত্ব অর্থাৎ সমকালীন আগ্নেয় শিলা দেখা
যায় সিলেট আর শিলংয়ে এবং অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তে – যেটা ভারত আর অস্ট্রেলিয়া
যে এক সময় যুক্ত ছিলো তার প্রমাণ। আর সেখান থেকেই শুরু ভারতীয় প্লেটের উত্তরমুখী মহাযাত্রা।
শুধু গতিতেই না, সে পাড়ি দিয়েছিল মহাসাগর। ৭ কোটি বছরে সে পেরিয়েছে ৯ হাজার কিলোমিটার।
ছুটে আসা এই গতিটা বুঝতে হলে আমাদের ভূতাত্ত্বিক স্কেলে চিন্তা করতে হবে।
মহাদেশীয় প্লেটগুলোর গতি সাধারণত বছরে
সাড়ে ৫ সেন্টিমিটারের মতো। সেখানে ভারত ছুটেছে তার প্রায় ৪ গুণ বেশি বেগে। ভারত বছরে
এগিয়েছে প্রায় ২০ সেন্টিমিটার। কারণটা কী? অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের এই টেকটোনিক
প্লেটের পুরুত্ব মাত্র ১০০ কিলোমিটারের মতো। যেখানে গন্ডোয়াল্যান্ড-এর অন্যান্য অংশগুলো
১৮০ কিলোমিটারের কিংবা তারও বেশি পুরুত্বের। ফলে এর গতিবেগ ছিলো সবচেয়ে বেশি৷ আমরা
জানি, আপনি যতো জোরে এবং গতিতে ধাক্কা দেবেন, তার প্রতিক্রিয়াটাও হবে ততো বেশি। ইউরোশিয়ান
অর্থাৎ ইউরোপ এবং এশিয়া যে টেকটনিক প্লেটের উপর অবস্থিত তার সাথে প্রবল সংঘর্ষে লিপ্ত
হয় ভারতীয় প্লেট।
এখানে বলে রাখা প্রয়োজন; সাধারণত দুইটা
প্লেটের সংঘর্ষে তিন ধরনের ঘটনা ঘটে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প, মুখোমুখি
দুটি প্লেটের সংঘর্ষে একটা আরেকটার উপর চাপের ফলে মাঝে মাঝেই মাটি উপর দিকে উঠে সৃষ্টি
হয় পাহাড় পর্বত। আর সে কারণেই দুই প্লেটের মহা সংঘর্ষ থেকে সৃষ্টি হয়েছে; এভারেস্ট,
কাঞ্চনজঙ্ঘা আর অন্নপূর্ণার মতো বিশাল সব পর্বতমালা।
এ তো গেলো হিমালয় সৃষ্টি রহস্য। এবার
আসা যাক বঙ্গের ভূমিরূপ বা আমাদের এই ভূখণ্ড কী ভাবে হলো এবং বাংলাদেশের পাহাড়গুলো
কবেকার সৃষ্টি তা জানার চেষ্টা করি।
এটা নিশ্চয়ই অনেকেরই জানা, গাঙ্গেয়
ব-দ্বীপ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত; ভারতীয় পাত, ইউরেশীয় পাত এবং
বার্মা পাত। বাংলাদেশের রংপুর, দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু এলাকা গন্ডোয়াল্যান্ড-এর
অন্তর্ভুক্ত থাকাকালীন সময় থেকেই ছিলো। কিন্তু বাকি অংশের কোনো অস্তিত্ব তখন ছিলো
না। এই অঞ্চল সৃষ্টি হয় হিমালয়ের সৃষ্টির পরপর। টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট
হিমালয় অঞ্চল স্থিতিশীল অবস্থায় আসতে সময় লাগে অনেক অনেক যুগের।
ওদিকে আবার ভারতীয় ভূত্বক আস্তে আস্তে
পশ্চিম বার্মার পাতের তলায় ঢুকতে শুরু করে। এটাকে ভূবৈজ্ঞানিক ভাষায় বলা হয়, “সাবডাকশন”।
ভারত যতোই ঢুকতে থাকে ততোই পশ্চিম বার্মা ব্লক উঁচু হয়ে তৈরি হয় নাগাল্যান্ড, আরাকান,
ইয়োমা পর্বতমালা।
এখানেই কিন্তু গল্প শেষ নয়; বরং বলতে
পারেন, সবে শুরু। যুগে যুগে হিমালয়ের স্থিতিকালে সাগরের ঢেউয়ের আঘাত পৌঁছায় হিমালয়ের
পাদদেশে, যেখানে দেখি শিবালিক পর্বত। সেখানেই তৈরি হয় গঙ্গা নদী। ফলে বিশাল পরিমাণ
পলিমাটি গঙ্গা নদী ধরে এসে জমা হতে শুরু করে বেঙ্গল বেসিনে। এদিকে বার্মা প্লেট বা
নাগাল্যান্ড এবং আরাকানী পাহাড় থেকেও আসতে থাকে পলিমাটি। আর ওদিকে তো ভারতীয় ভূখণ্ড
এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে আগেই এসেছিল বিশাল পরিমাণ পলিমাটি।
হিমালয় পর্বত স্থিতিশীল হতে হতে ব্রহ্মপুত্র
তার মূল গতিপথ পরিবর্তন করে বাংলাদেশে বিশাল এক পলিমাটির ডালি নিয়ে প্রবেশ করে। গঙ্গা
ও ব্রহ্মপুত্র এভাবে পলিমাটি বহন করে নিয়ে না এলে ব-দ্বীপের এতো বিস্তীর্ণ অঞ্চল তৈরি
হতে পারতো না। ধারণা করা হয় আজও এগুলো সম্মিলিতভাবে প্রতি বছর ১’শ কোটি টনের বেশি
পলি নিয়ে আসে বঙ্গীয় বদ্বীপে। এর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ভাগ থেকে যায় দেশের ভেতরে বা উপকূলে
এবং বাকি ৫০ থেকে ৬০ ভাগ উপকূলের কাছে বা দক্ষিণের ব-দ্বীপে জমা হয়।
কোটি কোটি বছর ধরে পলি জমার ফলে আজকে
বরিশাল অঞ্চল ২০ কিলোমিটার এবং ঢাকা প্রায় ১৫ কিলোমিটার অভিক্ষিপ্ত পলির উপর বসে আছে।
আবার সুন্দরবন উপকূ্লের দক্ষিণে সাগর এর ভেতরে সুয়োজ গিরিখাত দিয়ে বিশাল প্রবাহ বয়ে
গিয়ে তৈরি হয়েছে ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার উঁচু বেঙ্গল ফ্যান। তবে এ কে বঙ্গীয় ব-দ্বীপ
থেকে আলাদা বলেই ধরা হয়৷ এভাবে কোটি কোটি বছর ধরে বহু পথ বেয়ে, বহু ভূখণ্ডের পলিমাটি
জমে তৈরি হয়েছে আমাদের এই বঙ্গীয় ব-দ্বীপ।
সিলেট অঞ্চলে জমা চুনাপাথর সেই সময়কার
ভেসে আসা পানির প্রবাহেরই নিদর্শন। এখন থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৫৩ লাখ বছর পূর্বে বার্মা
রেঞ্জের সাথে ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট-এর প্লেটের কয়েক দফা সংঘর্ষে বঙ্গীয় উপকূলে ত্রিভুজাকৃতির
চাপ পড়ে এবং পূর্বাংশে উঁচু নিচু ভাঁজের সৃষ্টি হয়। যার থেকে বান্দরবান, সিলেট, চট্টগ্রাম,
মেঘালয়, আসাম ও আরাকান রাজ্যের পাহাড় শ্রেণির সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি হয় সীতাকুন্ডু মিরেস্বরাই
রেঞ্জ, সিলেট রেঞ্জ, কুমিল্লার লালমাই, ময়মনসিংহের গারো পাহাড় এইসব মৃদু ভাঁজযুক্ত
পাহাড়। তারপর বছরের পর বছর ধরে রূপান্তরিত রূপ আজকের এই সব পাহাড় পর্বত।
বাংলাদেশকে কেনো বলা হচ্ছে ব-দ্বীপ?
ব-দ্বীপ শব্দটি আসলে গ্রিক ডেলটা থেকে এসেছে। বাংলায় ‘ব’ বর্ণটির সাথে ডেল্টার মিল
থাকায় বাংলায় ব-দ্বীপ নামটি প্রচলিত হয়। কালে কালে নদীর মোহনায় পলি জমে দ্বীপে রূপান্তরিত
হয়। কিন্তু মাঝ বরাবর দ্বীপ গঠিত হওয়ায় দুই পাশের জলাধার আবার সেদিকে ক্ষয় করতে শুরু
করে। ফলে দ্বীপটি বাংলা অক্ষর মাত্রাছাড়া ‘ব’-এর মতো অথবা ইংরেজি অক্ষর উল্টে ‘ভি’-এর
মতো আকার পায়। যার ফলে এ কে ব-দ্বীপ বা বেসিন বলে। আর এরকম অসংখ্য ব-দ্বীপ মিলে আমাদের
এই বাংলাদেশ গঠিত হয়েছে বলেই এ কে ব-দ্বীপ বলে।
প্রকারভেদ অনুসারে বঙ্গীয় ব-দ্বীপ
ত্রিকোণাকার ব-দ্বীপ শ্রেণির। ব-দ্বীপটি বাংলাদেশ এবং ভারতে বিস্তৃত থাকলেও উত্তরে
ভুটান, তিব্বত, ভারত ও নেপাল থেকে সৃষ্ট নদীগুলো এই ব-দ্বীপের মধ্য দিয়ে নিষ্কাশিত
হয়। ব-দ্বীপটির প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে এবং ৪০ শতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত।
বাংলাদেশে অবস্থিত ব-দ্বীপের আয়তন ৮০ হাজার বর্গ কিলোমিটার।
এভাবে দুই বাংলা পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ
সুন্দরবন সৃষ্টি করে, যার আয়তন প্রায় ১ লাখ বর্গকিলোমিটারের দুই তৃতীয়াংশ, প্রায়
৭৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার জায়গা রয়েছে বাংলাদেশে। এজন্য এই ব-দ্বীপ সুন্দরবন ব-দ্বীপ
বা বঙ্গীয় ব-দ্বীপ নামে পরিচিত। এটিকে সবুজ ব-দ্বীপও বলা চলে।
সূত্রঃ সময় টিভি









Leave a Reply